বাংলা বিনোদন জগতে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের যাত্রাপথ শুনলে বোঝা যায় সাফল্য কখনও হঠাৎ আসে না—তার পেছনে থাকে বছরের পর বছর প্রস্তুতি, দোলাচল আর সাহসী সিদ্ধান্ত। আজ যাঁকে দর্শক এক নামে চেনেন, তাঁর জীবনের গল্পটা কিন্তু পর্দার চরিত্রের থেকেও কম নাটকীয় নয়। একদিকে স্থায়ী চাকরি, অন্যদিকে অভিনয়ের অদম্য টান—এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই কেটেছে বহু বছর।
২০১৮ সাল থেকে তিনি ‘একেন বাবু’ সিরিজে অভিনয় করছেন। সেই ‘একেনবাবু’ চরিত্রই তাঁকে টলিউডে এক আলাদা পরিচয় দিয়েছে। সাধারণ চেহারার, খাদ্যপ্রেমী অথচ তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মানুষ—এই বৈপরীত্যই চরিত্রটিকে জনপ্রিয় করে তোলে। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি। ছোটবেলাতেই, যখন তিনি ক্লাস ফোরে পড়েন, তখন থেকেই থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হন। শিশুদের আলাদা নাটক নয়, সরাসরি বড়দের দলে সুযোগ পেয়েছিলেন, কারণ সেই দলে একটি শিশুশিল্পীর প্রয়োজন ছিল। প্রথমে পড়াশোনার চাপ থেকে একটু মুক্তি পাওয়ার আনন্দই ছিল বড় প্রাপ্তি, কিন্তু সময়ের সঙ্গে অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা গভীর হতে থাকে।
বড় হয়ে কলকাতায় চাকরি পাওয়ার পরেও নাটকের টান ছাড়েননি। নির্দিষ্ট কোনও দলে বাঁধা না থাকলেও ডাক পেলেই বিভিন্ন নাট্যদলের সঙ্গে কাজ করেছেন। ‘মাঙ্গলিক’, ‘চেতনা’র মতো নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। একদিকে চাকরি, অন্যদিকে মঞ্চ—এই দুই সামলাতে সামলাতে ভিতরে ভিতরে বাড়ছিল এক অদ্ভুত আফসোস। মনে হতো, অভিনয়টাই যেন তাঁর প্রকৃত জায়গা, অথচ চাকরির দায়বদ্ধতা তাঁকে আটকে রাখছে।
প্রায় ১৪ বছর একাডেমিক ক্ষেত্রে কাজ করার পর জীবনের মোড় ঘোরান তিনি। ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রফেসরের স্থায়ী চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি অভিনয়ে মন দেন। চল্লিশের কোঠায় এসে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়, কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন—নিজের সত্যিকারের চাওয়াকে অস্বীকার করলে শান্তি মিলবে না কোনোদিন। এরপর একের পর এক কাজ—‘ফোড়িং’, ‘মেরি পেয়ারি বিন্দু’, ‘ঘরে বাইরে আজ’, ‘মিতিন মাসি’, ‘কাকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘খাদান’—পাশাপাশি ওয়েব সিরিজ ‘লালবাজার’, ‘কেস জন্ডিস’ এবং ফেলুদা ফেরৎ-এ জটায়ুর চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের বহুমুখী দক্ষতার প্রমাণ দেন।
আরও পড়ুনঃ কলকাতার গৃহসহায়িকাদের অর্ধেকের বেশি চো’র! রোজকার সাহায্যকারীদের অপমান করে ফের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরমা বন্দ্যোপাধ্যায়!
আজ অনির্বাণ চক্রবর্তী শুধু একেনবাবু নন, তিনি প্রমাণ যে সঠিক সময়ে নেওয়া সাহসী সিদ্ধান্ত জীবন বদলে দিতে পারে। চাকরি আর স্বপ্নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যে মানুষ নিজের মনের কথা শুনতে পারেন, তাঁর গল্পই শেষ পর্যন্ত দর্শকের মনে সবচেয়ে গভীর ছাপ ফেলে।
