দুর্গাপুজোর আগে বাংলায় এসে বাগেশ্বর ধামের প্রধান পুরোহিত ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। দুর্গাপুজোর সময়ে বাঙালিদের আমিষ খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। এমনকি পুজোর সময়ে মাছ-মাংস খাওয়ার বিরুদ্ধেও নিজের মত প্রকাশ করেছিলেন বাগেশ্বর বাবা। তাঁর বক্তব্য ঘিরে বাংলার খাদ্যাভ্যাস এবং সংস্কৃতিতে বাইরের কারও হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে চাপানউতোর। বঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বাঙালি কী খাবে বা কী পরবে, তা কোনও সাধু বা অন্য কেউ ঠিক করে দিতে পারেন না। অগ্নিমিত্রা পালও জানিয়েছেন, বাগেশ্বর বাবা নিজের মত বলেছেন, তা নিয়ে রাজনীতি করার প্রয়োজন নেই।
এই পরিস্থিতিতেই বাগেশ্বর বাবার মন্তব্য নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন অভিনেত্রী পাওলি দাম। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে খাবারের বিষয়টিকে শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে নয়, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন অভিনেত্রী। পাওলির বক্তব্য, কোনও রাজনৈতিক দল অন্য একজন মানুষ কী খাবেন, তা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার রাখে না। কোনও রাজনৈতিক নেতা বা কোনও সাধু, গুরু বা ধর্মীয় ব্যক্তিরও সেই অধিকার নেই। কারণ একজন মানুষ কী খাবেন, সেটা তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। এর পাশাপাশি খাবারের সঙ্গে মানুষের সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের সম্পর্কও রয়েছে বলে মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। তাই খাবার নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সম্মান করার বার্তাই দিয়েছেন পাওলি।
পাওলি দাম তাঁর বক্তব্যে আরও বলেছেন, বাংলা নিজের সংস্কৃতি এবং নিজস্ব পরিচয়ের জায়গা থেকেই এগিয়ে যাক। তাঁর মতে, বাংলার উন্নতি শুধু কোনও একটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সংস্কৃতির দিক থেকে বাংলা আরও সমৃদ্ধ হোক, এমনটাই তাঁর প্রত্যাশা। এর পাশাপাশি মানুষের বুদ্ধিমত্তা এবং চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রেও বাংলার আরও এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন অভিনেত্রী। শিল্পের ক্ষেত্রেও বাংলা যেন নিজের জায়গা আরও শক্ত করে, সেই বার্তাই উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে। তবে উন্নতির সঙ্গে নিজের শিকড়ের সম্পর্ক যেন কোনওভাবেই হারিয়ে না যায়, সেই বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। নিজের ঐতিহ্য এবং পরম্পরাকে সঙ্গে নিয়েই বাংলার এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন পাওলি।
বাংলায় দুর্গাপুজোর সঙ্গে খাবারেরও দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক যোগ রয়েছে। অনেক বাঙালি পরিবারে পুজোর সময়ে মাছ, মাংস এবং নানা ধরনের আমিষ পদ খাওয়ার চল রয়েছে। দুর্গাপুজো ও কালীপুজোকে ঘিরে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যসংস্কৃতিরও আলাদা আলাদা রীতি রয়েছে। এই কারণেই বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যের পর বিষয়টি শুধু খাবারের পছন্দের মধ্যে আটকে থাকেনি। এটি বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি এবং জীবনযাপনের স্বাধীনতা নিয়েও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও বলেছেন, বাঙালি যে খাবার এতদিন খেয়ে এসেছে, সেই খাবারই খাবে এবং বাইরের কেউ কী খেতে হবে তা ঠিক করে দিতে পারেন না। এই আবহেই পাওলি দামের বক্তব্যও নতুন করে বাংলার সংস্কৃতি, পরিচয় এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে।
পাওলি দামের বক্তব্যের মূল কথাটি হল, খাবার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির নিজেরই থাকা উচিত। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “কোনও রাজনৈতিক দল, কোনও নেতা এবং কোনও সাধু বা গুরুজির অধিকার নেই অন্য একজন মানুষ কী খাবেন তা ঠিক করে দেওয়ার।” তাঁর মতে, এটি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়, একইসঙ্গে এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের সংস্কৃতি এবং পরিচয়। এরপরই বাংলাকে নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন অভিনেত্রী। তিনি বলেছেন, “বাংলা সংস্কৃতিতে, বুদ্ধিমত্তায়, শিল্পে, নিজের ঐতিহ্য ও পরম্পরায় বিকশিত হোক।” অর্থাৎ অন্যের নির্দেশে নিজের পরিচয় বদলানোর পরিবর্তে নিজের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়েই বাংলা এগিয়ে যাক, এমন বার্তাই দিয়েছেন পাওলি। বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যকে ঘিরে যখন রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিতর্ক তুঙ্গে, তখন অভিনেত্রীর এই বক্তব্যও সেই বিতর্কে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
