রাজ্যের প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী এবং গায়ক ইন্দ্রনীল সেনকে গ্রেপ্তার করেছে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। পুজোর ই-পাস সংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের মামলায় এই গ্রেপ্তারি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বুধবার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের দফতরে জিজ্ঞাসাবাদের পর বেরোনোর সময় তাঁকে আটক করা হয়। এর পর তাঁকে লালবাজারে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পরে গ্রেপ্তার করা হয়। ইন্দ্রনীল সেনের সঙ্গে ‘মাস আর্ট’ নামে একটি সংস্থার যোগ থাকার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে। অভিযোগ, দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো এবং বিশেষ প্রবেশের পাস বিক্রির ক্ষেত্রে ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহার করা হয়েছিল। এই ঘটনায় কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি। ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেপ্তারির খবর সামনে আসতেই সমাজমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেন টলিপাড়ার একাধিক পরিচিত মুখ।
এই ঘটনায় সঙ্গীতশিল্পী ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে। ফোনে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট জানান, ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেপ্তারিতে তিনি খুশি ঋদ্ধির কথায়, “আমি মনে করি যে যা করবে সে তার ফল এ জীবনেই পেয়ে যাবে। এই গ্রেপ্তারে আমি খুশি।” এর আগেও ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলেছিলেন ঋদ্ধি এবং কয়েক জন সঙ্গীতশিল্পী। তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর জনতার দরবারে গিয়ে সঙ্গীত জগতে মঞ্চ বণ্টন এবং কাজের সুযোগ নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। তৎকালীন সরকারের আমলে সঙ্গীত জগতেও ‘সিন্ডিকেটরাজ’ চলত বলে অভিযোগ করেছিলেন তাঁরা। ঋদ্ধিরা এমনও দাবি করেছিলেন যে চাকরি বিক্রির মতোই মঞ্চ বিক্রির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ ছিল, ক্ষমতাবানদের প্রভাবের কারণে অনেক শিল্পী তাঁদের প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
নিজের দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতার কথাও এ দিন তুলে ধরেন ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, তিনি প্রায় ২৬ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত এবং আন্তর্জাতিক স্তরেও কাজ করেছেন। তারপরেও যদি কোনও শিল্পীকে কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে নতুন শিল্পীদের অবস্থা আরও কঠিন হয়ে যায় বলে তাঁর বক্তব্য। ঋদ্ধি বলেন, “আমার সঙ্গে যদি এই ঘটনা ঘটে, সব জায়গায় ব্যান করা, আমি হল পাব না সরকারের। তাহলে গ্রামগঞ্জ থেকে যে সব ছেলেমেয়েরা কাজ করতে আসবে তারা ‘অ্যাজেন্ডা মেকআপ’ না করতে পারলে তাদের অবস্থা কী হবে।” প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের চারপাশে স্বার্থসিদ্ধির জন্য একাংশের মানুষ ঘোরাফেরা করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ঋদ্ধির কথায়, “আজকে যে রাজ্যের অবস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে এগুলোই তার অন্যতম কারণ।” তিনি আরও বলেন, “যিনি প্রশাসনে-চেয়ারে থাকবেন তার চারপাশে যে চাটুকারদের দল ঘুরঘুর করবে নিজেদের ধান্দার জন্য।” এই প্রসঙ্গে তিনি আগের মুখ্যমন্ত্রীরও ভাবা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন।
ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেপ্তারির পর শুধু ঋদ্ধি নন, বিনোদন জগতের আরও কয়েক জনের প্রতিক্রিয়াও সামনে এসেছে। অরিত্র দত্ত বণিক-সহ অন্যরাও সমাজমাধ্যমে এই ঘটনা নিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। ইন্দ্রনীলের গ্রেপ্তারির খবরকে ঘিরে সমাজমাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ পুরনো অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন, কেউ আবার ঘটনাটির আইনি দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে এর আগেও মঞ্চ বণ্টন এবং শিল্পীদের কাজের সুযোগ নিয়ে যে অভিযোগগুলি উঠেছিল, সেগুলিও ফের আলোচনায় এসেছে। তবে এই অভিযোগগুলি সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের বক্তব্য এবং এখনও তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। অভিযোগ ওঠা এবং আদালতে কোনও অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়, তাই তদন্তের ফলাফলের দিকেই এখন নজর রয়েছে। ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেপ্তারির পর টলিপাড়ার পরিচিত মুখেদের প্রতিক্রিয়াই দেখিয়ে দিচ্ছে, ঘটনাটি নিয়ে সাংস্কৃতিক মহলেও যথেষ্ট আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এ দিকে, ইন্দ্রনীল সেনকে ঘিরে চলা তদন্তে পুজোর পাস বিক্রি এবং সেই সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তদন্তকারীরা সংস্থাটির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কোথায় গিয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন। ইন্দ্রনীল সেন এবং তাঁর স্ত্রী মধুচ্ছন্দা সেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাটির যোগ থাকার অভিযোগও তদন্তের অংশ। দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো এবং বিশেষ প্রবেশের পাসের মাধ্যমে টাকা তোলার অভিযোগের ভিত্তিতেই পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না। তবে গ্রেপ্তারির পর ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য এবং অরিত্র দত্ত বণিক-সহ অন্যদের সমাজমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ঋদ্ধির ‘যে যা করবে সে তার ফল এ জীবনেই পেয়ে যাবে’ মন্তব্যটি ঘিরে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। এখন তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং এই মামলায় পরবর্তী সময়ে আর কী তথ্য সামনে আসে, সে দিকেই নজর থাকবে।
