বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মহানায়ক উত্তম কুমারের নাম চিরস্মরণীয়। পর্দায় তাঁর ব্যক্তিত্ব, অভিনয় এবং মায়াবী হাসিতে মুগ্ধ ছিল কয়েক প্রজন্ম। কিন্তু ক্যামেরার বাইরের উত্তম কুমার ছিলেন অনেকটাই অন্যরকম। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ঈশ্বরবিশ্বাসী। দিনের শুরু হত পুজো দিয়ে। ভবানীপুরের পৈতৃক বাড়ি হোক কিংবা ময়রা স্ট্রিটের বাসভবন, দুই জায়গারই ঠাকুরঘরের দায়িত্ব নিজের হাতে সামলাতেন তিনি। তাঁর স্বপ্নে পাওয়া গণেশের মূর্তির কাহিনি অনেকেরই জানা। তবে উত্তর কলকাতার একটি বিশেষ কালীপুজোর সঙ্গে মহানায়কের যে গভীর আত্মিক সম্পর্ক ছিল, তা হয়তো অনেকেরই অজানা।
উত্তর কলকাতার নব যুবক সঙ্ঘের কালীপুজো আজও মানুষের কাছে পরিচিত ফাটাকেষ্টর পুজো নামে। একসময়ে কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত ওরফে ফাটাকেষ্টর হাত ধরে এই পুজোর সূচনা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পুজো হয়ে উঠেছিল কলকাতার অন্যতম আকর্ষণ। শুধু সাধারণ মানুষ নন, বলিউডের একাধিক তারকাও এই পুজোয় উপস্থিত হতেন। অমিতাভ বচ্চন, রাজেশ খান্না, বিনোদ খান্নার মতো তারকাদের আনাগোনা ছিল এই মণ্ডপে। আর মহানায়ক উত্তম কুমারের উপস্থিতি ছিল প্রায় নিয়মের মতো। কথিত আছে, কালীপুজোর কয়েক দিন আগে ফাটাকেষ্ট নিজে মিষ্টির হাঁড়ি ও নিমন্ত্রণপত্র নিয়ে মহানায়কের বাড়িতে পৌঁছে যেতেন। উত্তম কুমারও সেই আমন্ত্রণের অপেক্ষায় থাকতেন।
প্রবীণদের মুখে শোনা যায়, ফাটাকেষ্টর পুজোর মা কালীর প্রতি উত্তমের ছিল অগাধ বিশ্বাস। দেবীর কাছে যা চেয়েছেন, তা পেয়েছেন বলেই মনে করতেন তিনি। কিন্তু ১৯৭৯ সালের কালীপুজোয় ঘটে এমন এক ঘটনা, যা পরবর্তীকালে মহানায়কের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আবেগঘন স্মৃতি হয়ে ওঠে। তখনও কেউ জানতেন না, আর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই চিরতরে হারিয়ে যাবেন বাংলা সিনেমার এই কিংবদন্তি।
সেই সময়ের একটি জনপ্রিয় বিনোদন পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের দীপাবলিতে অন্যান্য বছরের মতোই ফাটাকেষ্টর কালীপুজোয় হাজির হয়েছিলেন উত্তম কুমার। তাঁকে একঝলক দেখার জন্য মণ্ডপের আশপাশে ভিড় জমিয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। গলির মুখে গাড়ি থামিয়ে ভিড় পেরিয়ে সোজা দেবীর সামনে গিয়ে দাঁড়ান তিনি। কিন্তু প্রতিমার সামনে দাঁড়াতেই বদলে যায় মহানায়কের চেনা অভিব্যক্তি। আচমকাই দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে জল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফাটাকেষ্ট এবং উত্তমের ম্যানেজারও কার্যত স্তব্ধ হয়ে যান।
এরপর চোখের জল মুছতে মুছতে দেবীর উদ্দেশে কয়েকটি কথা বলেন মহানায়ক। তাঁর কণ্ঠে ছিল গভীর আবেগ। তিনি বলেন, মা তাঁকে জীবনে সবকিছু দিয়েছেন। তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। কিন্তু সেদিন তাঁর মন যেন বারবার বলছিল, এটাই হয়তো দেবীর কাছে তাঁর শেষ আসা। তাই মায়ের কাছে তাঁর একটাই প্রার্থনা, তাঁকে যেন একটু শান্তি দেওয়া হয়। মহানায়কের মুখে এমন কথা শুনে উপস্থিত মানুষজনও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
সেদিন ফেরার আগে অবশ্য নিজের চেনা হাসি ফিরিয়ে আনেন উত্তম কুমার। অনুরাগীদের দিকে তাকিয়ে শুভ দীপাবলির শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছিলেন, আবার দেখা হবে। কিন্তু সেই দেখা আর হয়নি। ১৯৮০ সালের জুলাই মাসে প্রয়াত হন মহানায়ক। ফলে ১৯৭৯ সালের সেই কালীপুজোর রাত আজও উত্তম কুমারের জীবনের এক আবেগঘন অধ্যায় হয়ে রয়েছে। সত্যিই কি সেদিন নিজের বিদায়ের কোনও আভাস পেয়েছিলেন তিনি, নাকি নিছকই মনের গভীরে জমে থাকা বিষাদ থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেই কথা? উত্তর অজানা। তবে ফাটাকেষ্টর কালীমণ্ডপে তাঁর সেই অঝোর কান্না আজও স্মৃতিতে অমলিন।
