মহালয়ার ভোরে টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া। বলিষ্ঠ চেহারা, ভয় ধরানো অভিব্যক্তি আর সেই পরিচিত অট্টহাসি বাঙালির মনে আজও যেন জীবন্ত হয়ে রয়েছে সেই ছবি। একসময় যে অভিনেতাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করতেন দর্শক, জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাঁর ভাগ্যে কী জুটেছিল? কেন নিঃসঙ্গ অবস্থায় দিন কাটাতে হয়েছিল তাঁকে? এমনকী, শেষ পর্যন্ত তাঁর ঘরের তালা ভেঙে উদ্ধার করতে হয়েছিল দেহ। পর্দার সেই পরিচিত মুখের বাস্তব জীবনের করুণ পরিণতি আজও নাড়া দেয় দর্শকদের।
নয়ের দশকে দূরদর্শনের মহালয়ার অনুষ্ঠানে মহিষাসুরের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন অমল চৌধুরী। ‘অমল অসুর’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। দেবী দুর্গার সঙ্গে মহিষাসুরের লড়াইয়ের দৃশ্যে তাঁর অভিনয় এবং ব্যক্তিত্ব ছিল বিশেষ আকর্ষণ। শুধু মহিষাসুর নয়, মহালয়ার অনুষ্ঠানে যমরাজ ও সেনাপতির মতো চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন তিনি। পাশাপাশি বেশ কিছু চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিনোদন জগতে তাঁর উপস্থিতি কমতে থাকে। যে পরিচিতি একসময় তাঁকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল, তা আর জীবনের শেষ দিনগুলিতে আর্থিক নিরাপত্তা দিতে পারেনি।
অশোকনগরের সিংহি পার্ক এলাকায় একটি টিনের চালের ঘরে একাই থাকতেন অমলবাবু। বাবা-মা, দাদা-দিদিদের হারানোর পর জীবনে একাকিত্ব আরও বেড়ে গিয়েছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অসুস্থতাও সঙ্গী হয়। আর্থিক অনটনের কারণে দৈনন্দিন জীবন চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছিল তাঁর। ২০২৫ সালে একটি দুর্ঘটনায় তাঁর পায়ে চিড় ধরে। চিকিৎসার জন্য প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ টাকা প্রয়োজন হওয়ায় সংবাদমাধ্যমের সামনে সাহায্যের আবেদনও জানিয়েছিলেন তিনি। অথচ একসময় যাঁর অভিনয় মহালয়ার অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল, সেই মানুষকেই শেষ বয়সে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়েছিল।
আরও পড়ুনঃ “ঝগড়া করে নয়, নিজের মতো করেই থাকতে চেয়েছিলাম…” ৪০ দিন পর বিগ বসের ঘর থেকে বিদায়, খাবারের অভাব থেকে হঠাৎ মিড উইক এলিমিনেশন, রিয়েলিটি শো কি আদেও রিয়েল? প্রতিযোগীদের কোন অজানা কথা ফাঁস করলেন দীপেন্দু বিশ্বাস?
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ঘটে যায় সেই মর্মান্তিক ঘটনা। দীর্ঘক্ষণ ঘরের ভিতর থেকে কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে সন্দেহ হয় প্রতিবেশীদের। ডাকাডাকি করেও সাড়া না মেলায় খবর দেওয়া হয় পুলিশে। পরে বাড়ির তালা ভেঙে উদ্ধার করা হয় অমল চৌধুরীর নিথর দেহ। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। অভিনয়ের পাশাপাশি ছবি আঁকাতেও দক্ষ ছিলেন অমলবাবু। বহু শিশুকে বিনা পারিশ্রমিকে আঁকা শিখিয়েছিলেন তিনি। অথচ তাঁর নিজের জীবনের শেষ অধ্যায় কাটল চরম অভাব ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে। মহালয়ার পর্দায় যাঁর অভিনয় আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল, তাঁর জীবনকাহিনি মনে করিয়ে দেয় খ্যাতি থাকলেও একজন শিল্পীর জীবনের শেষ দিনগুলি সবসময় সুরক্ষিত হয় না।
