বিনোদন জগতে এমন অনেক শিল্পী রয়েছেন, যাঁরা নিজেদের কাজের মাধ্যমে দর্শকদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিলেও একসময় ধীরে ধীরে লাইমলাইট থেকে সরে যান। দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা, পরিচিতি এবং ভালোবাসা পাওয়ার পরেও অনেকেই ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার কিংবা অন্য কোনও সৃজনশীল কাজকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। ফলে দীর্ঘদিন পর্দায় দেখা না গেলেও তাঁদের নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ কখনও কমে না। বাংলা টেলিভিশনের এমনই এক অত্যন্ত পরিচিত মুখ চৈতালি দাশগুপ্ত, যিনি একসময় দূরদর্শনের পর্দায় ঘরে ঘরে পরিচিত ছিলেন এবং পরবর্তীকালে অভিনয় জগতেও নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিলেন।
চৈতালি দাশগুপ্তের বিনোদন জগতে পথচলা শুরু হয়েছিল দূরদর্শনের একেবারে শুরুর দিনগুলোতে। সত্তরের দশকে কলকাতা দূরদর্শনের ঘোষিকা ও সঞ্চালিকা হিসেবে তিনি কাজ শুরু করেন। সেই সময় তাঁর সঙ্গে শাশ্বতী গুহঠাকুরতার জুটি ছিল দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। অনেকেই তাঁদের দুই বোন বলে মনে করতেন। পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে দর্শকরা জানতে পারেন যে তাঁরা রক্তের সম্পর্কের বোন নন, বরং অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মী। ‘সাপ্তাহিকী’ এবং ‘দর্শকের দরবারে’-র মতো অনুষ্ঠান তাঁকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। ক্যামেরার সামনে তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা এবং সহজ-সরল কথাবলার ভঙ্গি খুব দ্রুতই দর্শকদের মন জয় করেছিল।
শুধু সঞ্চালনাতেই নয়, পরবর্তীকালে অভিনয় জগতেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন চৈতালি। যদিও ছোটবেলা থেকে অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন তিনি দেখেননি বলেই জানিয়েছেন। তবুও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিনয়ের সুযোগ আসে এবং তিনি একাধিক চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিকে কাজ করেন। ‘শুধু তুমি’, ‘লাভ’, ‘বাপি বাড়ি যা’, ‘দ্য রিইনকারনেট’ এবং ‘ঘরে ফেরার গান’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। পাশাপাশি তিনি এমন এক পরিবারের সদস্য, যাদের সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর স্বামী পরিচালক রাজা দাশগুপ্ত, ছেলে পরিচালক বিরসা দাশগুপ্ত এবং পুত্রবধূ অভিনেত্রী বিদীপ্তা চক্রবর্তী। অভিনয়ের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাতেও তিনি নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন।
এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের নানা অজানা অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন চৈতালি দাশগুপ্ত। তিনি জানান, পড়াশোনা করার সময় থেকেই দূরদর্শনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ শুরু হয়েছিল। সেই সময় পরিবার থেকে কোনও বাধা আসেনি। এমনকি রেকর্ডিংয়ের কাজ শেষ করে অনেক রাতে বাড়ি ফিরলেও পরিবারের তরফে কোনও আপত্তি ছিল না। ধীরে ধীরে তাঁর পাড়ার মানুষও জানতে পারেন তিনি দূরদর্শনে কাজ করেন। চৈতালির কথায়, সবাই তাঁকে উৎসাহ দিতেন এবং তাঁর কাজের প্রশংসা করতেন। শুধু তাই নয়, তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ভবিষ্যতে অনেকেই এই পেশায় আসার সাহস পেয়েছিলেন বলেও তিনি মনে করেন। শাশ্বতী গুহঠাকুরতার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব নিয়েও তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন। দর্শকদের কাছে তাঁদের জুটি এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে অনেকেই তাঁদের আপন দুই বোন বলে মনে করতেন।
তবে বর্তমানে কেন তাঁকে আর নিয়মিত ধারাবাহিক বা অভিনয়ের জগতে দেখা যায় না, সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন তিনি। চৈতালির কথায়, প্রথম জীবন থেকে তিনি অভিনয়কে পেশা হিসেবে ভাবেননি। পরে যে ক’টি কাজ করেছেন, তা পরিস্থিতির কারণে এবং সুযোগের হাত ধরেই। কিন্তু গত কয়েক বছরে অভিনয়ের জন্য খুব বেশি ডাকও পাননি। তার থেকেও বড় কথা, এখন তিনি নিজের পরিবারকে বেশি সময় দিতে চান। পাশাপাশি লেখালিখির প্রতি তাঁর আগ্রহ অনেক বেড়েছে। নিজের সাহিত্যচর্চা এবং বই লেখার কাজ নিয়েই তিনি বেশি সময় কাটাতে চান। তাই ইচ্ছাকৃতভাবেই অভিনয়ের ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা দূরে সরে এসে নিজের পছন্দের কাজ এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোকে প্রাধান্য দিচ্ছেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী।
