“উজানকে নিজের ডানায় উড়তে শিখিয়েছি, কিন্তু মাকে শেষবার ছুঁয়ে দেখতে না পারার কষ্ট আজও বয়ে বেড়াই!” মা হিসেবে নিজেকে দিলেন ৯, কিন্তু মেয়ে হিসেবে একটা আক্ষেপ আজও তাঁকে তাড়া করে? প্রকৃতিই আমার ঈশ্বর, পরিবারই আমার শক্তি…মাতৃত্ব থেকে জীবনদর্শন, অকপটে চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়!

বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী, চিত্রনাট্যকার এবং পরিচালক চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় (Churni Ganguly) দীর্ঘদিন ধরেই নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করে চলেছেন। কার্শিয়াংয়ে বেড়ে ওঠা চূর্ণী পড়াশোনা করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে থিয়েটারের হাত ধরে অভিনয় জগতে প্রবেশ করেন। বাংলা ছবির পাশাপাশি হিন্দি ধারাবাহিকেও কাজ করেছেন তিনি। পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য জীবন তিন দশকেরও বেশি সময়ের। তাঁদের একমাত্র ছেলে উজান গঙ্গোপাধ্যায়ও এখন অভিনয় জগতের পরিচিত মুখ। ‘ওয়ারিশ’, ‘শব্দ’, ‘ল্যাপটপ’, ‘দৃষ্টিকোণ’, ‘কাবেরী অন্তর্ধান’, ‘অর্ধাঙ্গিনী’, ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’ এবং পরিচালক হিসেবে ‘নির্বাসিত’ ও ‘তারিখ’-এর মতো কাজের মাধ্যমে তিনি আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছেন।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, মাতৃত্ব এবং জীবনদর্শন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন চূর্ণী। তাঁর কথায়, পরিবারের মানুষরাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। স্বামী কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, ছেলে উজান এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা সব সময় তাঁর পাশে থাকেন। ভালো সময় হোক বা কঠিন পরিস্থিতি, একে অপরকে সমর্থন করাই তাঁদের পরিবারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। এই পারস্পরিক বিশ্বাস এবং পাশে থাকার মানসিকতাই তাঁকে জীবনের প্রতিটি লড়াইয়ে শক্তি জুগিয়েছে বলে জানান অভিনেত্রী। তাঁর মতে, পরিবারের সমর্থন থাকলে কঠিন সময়ও অনেক সহজ হয়ে যায়।

সাক্ষাৎকারে নিজের সম্পর্কের মূল্যায়নও করেন চূর্ণী। তিনি জানান, স্ত্রী হিসেবে নিজেকে ৫ নম্বর দিলেও মা হিসেবে নিজেকে ৯ নম্বর দেবেন। কারণ, সন্তানকে বড় করার ক্ষেত্রে তিনি নিজের সর্বস্ব দিয়েছেন। তবে তিনি কখনও ছেলেকে অতিরিক্ত আগলে রাখতে চাননি। বরং চেয়েছেন, উজান নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে শিখুক এবং নিজের ডানায় ভর করে জীবনে এগিয়ে যাক। তাঁর মতে, একজন ভালো মা হওয়ার অর্থ শুধু সন্তানকে রক্ষা করা নয়, তাকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে শেখানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভালোবাসার প্রকৃত অর্থও তাঁর কাছে দায়িত্ব নেওয়া, যত্ন করা এবং প্রিয় মানুষের পাশে থাকা।

তবে জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপের কথাও লুকিয়ে রাখেননি চূর্ণী। তিনি জানান, ২০২১ সালে কোভিড পরিস্থিতির সময় তাঁর মা মারা যান। সেই সময় নানা বিধিনিষেধের কারণে তিনি মায়ের শেষ মুহূর্তে পাশে থাকতে পারেননি। এমনকি শেষবারের মতো মায়ের হাতও ধরে বিদায় জানাতে পারেননি। অভিনেত্রীর কথায়, এই স্মৃতি আজও তাঁকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়। জীবনের অনেক সাফল্য এলেও এই অপূর্ণতা কখনও পূরণ হবে না বলেই মনে করেন তিনি। মাকে শেষবার স্পর্শ করতে না পারার যন্ত্রণা এখনও তাঁর মনে একই রকম তাজা হয়ে রয়েছে।

শৈশবের স্মৃতির প্রসঙ্গ উঠতেই চূর্ণী জানান, এখনও তাঁর কাছে ছোটবেলার একটি চশমা পরা পুতুল রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই তিনিও চশমা ব্যবহার করতেন। তাই সেই পুতুলটির সঙ্গে নিজের এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। এত বছর পরেও সেই স্মৃতি তিনি যত্ন করে আগলে রেখেছেন। তাঁর মতে, ছোটবেলার কিছু জিনিস শুধুই বস্তু নয়, সেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আবেগ, স্মৃতি এবং জীবনের অনেক সুন্দর মুহূর্ত। তাই সেই পুতুলটি এখনও তাঁর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।

সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনদর্শনের কথাও তুলে ধরেন অভিনেত্রী। তিনি বলেন, পাহাড়ে বেড়ে ওঠার কারণেই নিজেকে ‘পাহাড়ি’ বলতে ভালোবাসেন। কার্শিয়াংয়ের প্রকৃতি তাঁর চিন্তাভাবনা এবং জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাঁর বিশ্বাস, প্রকৃতিই ঈশ্বর এবং সেই দর্শনই আজও তাঁর জীবনের অন্যতম ভিত্তি। পাহাড় তাঁকে ধৈর্য, শান্তি এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছে। তাই ব্যস্ত কর্মজীবনের মধ্যেও সুযোগ পেলেই তিনি প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চান এবং সেই জীবনবোধকেই নিজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন।

Piya Chanda

                 

You cannot copy content of this page