‘খারাপ নয়, শেষ হয়ে গিয়েছিল!’, প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতেই টলিউডের অতীত নিয়ে বি*স্ফোরক মিঠুন, ‘একনায়কতন্ত্র এসে গিয়েছিল, এবার তৃণমূলের বদমাইশি দেখলে…’ বদলের ডাক দিয়ে হুঁশিয়ারি মহাগুরুর?

দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্কে উত্তাল বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ। কখনও শুটিং বন্ধ, কখনও পরিচালক ও অভিনেতাদের কাজ থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ, আবার কখনও ফেডারেশনের অন্দরে একাধিক অনিয়ম নিয়ে সরব হয়েছেন ইন্ডাস্ট্রির সদস্যরা। গ্রেফতারি, মামলা-মোকদ্দমা এবং অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে গত কয়েক মাসে কার্যত অশান্ত হয়ে উঠেছিল টলিপাড়া। অবশেষে সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শনিবার, ৩১ অক্টোবর থেকে টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতে শুরু হয়েছে বিভিন্ন গিল্ডের নির্বাচন। রবিবার, ১ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর টলিউডের সাংগঠনিক কাঠামোয় এত বড় মাপের নির্বাচনী প্রক্রিয়া এই প্রথম। স্বাভাবিকভাবেই এই নির্বাচন ঘিরে এখন বাংলা বিনোদন জগতের নজর স্টুডিয়োপাড়ার দিকে।

নির্বাচন প্রক্রিয়া সঠিকভাবে এবং অবাধে হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে শনিবার সকালেই টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতে হাজির হন অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী। তাঁর পরনে ছিল কালো পোশাক, মাথায় কালো টুপি এবং গলায় উত্তরীয়। তবে কোনও বিশেষ আয়োজন নয়, স্টুডিয়োর বাইরে সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ারে বসেই চায়ে চুমুক দিতে দেখা যায় মহাগুরুকে। সেখানেই টিভি নাইন বাংলাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে টলিউডের বর্তমান পরিস্থিতি এবং গিল্ডের নির্বাচন নিয়ে নিজের মতামত জানান তিনি। একসময় বাংলা ইন্ডাস্ট্রির পরিবেশ কেমন ছিল, সেই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে মিঠুনের উত্তর ছিল বেশ স্পষ্ট। তাঁর কথায়, “খারাপ নয়, শেষ হয়ে গিয়েছিল! কেউ টলিউডে এসে কাজ করতেই চাইছিল না। সবাই বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল।” দীর্ঘদিন এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে অভিনেতা জানান, একসময় টলিউডের মানুষদের মধ্যে খুব সুন্দর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই পরিবেশ বদলে যায়।

টলিউডের সেই পরিস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিঠুন আরও বলেন, “আমরা জীবনভর এখানে কাজ করেছি, আমাদের মধ্যে একটা মিষ্টি সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এখানে একটা একনায়কতন্ত্র এসে গিয়েছিল।” তবে কারও নাম নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে কোনও মন্তব্য করতে চাননি তিনি। এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, “আমি কারও নাম নিয়ে আলাদা করে কিছু বলতে চাই না। কে কী করেছে, সেটা দেখার দরকার নেই। এখন যেটা হচ্ছে, তার উপর বিশ্বাস রাখুন।” অর্থাৎ, অতীতের বিতর্ক নিয়ে পড়ে না থেকে বর্তমানে যে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিয়েছেন অভিনেতা। পাশাপাশি আগামী দিনে বাংলা ছবির বাজার আরও বড় করার বিষয়েও আশাবাদী তিনি। সরকারের তরফে বাংলা ছবির জন্য ৩০ শতাংশ সাবসিডি দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মিঠুন। তাঁর বক্তব্য, “সরকার থেকে ৩০ শতাংশ সাবসিডি দেওয়া হচ্ছে। সবাই আসুন, যত খুশি ফিল্ম করুন। এতে প্রযোজকদের লাভ হবে।” বাংলা ছবির ব্যবসা বাড়াতে প্রযোজকদের আরও বেশি করে ছবি তৈরির আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

শুধু ছবি তৈরির ক্ষেত্রে সুবিধা নয়, বাংলা ছবির প্রদর্শন নিয়েও নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মিঠুন। তাঁর মতে, মাল্টিপ্লেক্সগুলিতে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলা ছবি দেখানোর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বাংলা ছবির বাজারকে আরও শক্তিশালী করতে এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে অভিনেতার বক্তব্য, “আর মাল্টিপ্লেক্সগুলিতে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলা ছবি চালাতে হবে।” তবে নিজের সমস্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক নিয়ম এবং সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা রাখার কথাও স্পষ্ট করেছেন মহাগুরু। তাঁর কথায়, “আমরা গণতন্ত্র ও সংবিধান মেনেই এগোতে চাই।” অর্থাৎ, ইন্ডাস্ট্রির পুরনো সমস্যাগুলি মিটিয়ে নতুন করে কাজের পরিবেশ তৈরি করতে চান তিনি। গিল্ডের নির্বাচনকে সেই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন অভিনেতা। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে নতুন নেতৃত্বের হাতে টলিউডের দায়িত্ব গেলে কাজের পরিবেশেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

তবে সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে নিয়ে মিঠুনের বক্তব্য ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। নির্বাচনের পরিবেশে কোনও ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বা অশান্তি তিনি বরদাস্ত করবেন না, সেই বার্তাই দিয়েছেন অভিনেতা। তৃণমূলের কোনও অংশের তরফে কোনওরকম অনিয়ম বা দাদাগিরি দেখলে তিনি চুপ করে থাকবেন না বলেও জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর কড়া হুঁশিয়ারি, “তৃণমূলের কোনও অংশের কোনও ধরনের বদমাইশি যদি আমি দেখি, তাহলে আমার থেকে খারাপ লোক আপনারা দেখেননি!” তাঁর এই মন্তব্য ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক এবং বিনোদন মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে টেকনিশিয়ানদের গিল্ড নির্বাচন, অন্যদিকে বাংলা ছবির ভবিষ্যৎ এবং ইন্ডাস্ট্রির কাজের পরিবেশ ফেরানোর পরিকল্পনা, সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে টলিউড। এই পরিস্থিতিতে মিঠুনের বক্তব্য এবং তাঁর দেওয়া কড়া বার্তা আগামী দিনে স্টুডিয়োপাড়ার পরিস্থিতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে সকলের ।

Piya Chanda

                 

You cannot copy content of this page