ভারতীয় সঙ্গীতজগতের অন্যতম কিংবদন্তি শিল্পী ঊষা উত্থুপ। কয়েক দশক ধরে তাঁর কণ্ঠে অসংখ্য জনপ্রিয় গান শ্রোতাদের মন জয় করেছে। শাড়ি, বড় টিপ, হাতে চুড়ি আর অনন্য গায়কির জন্য তিনি দেশের সীমানা ছাড়িয়েও পরিচিত। তবে শুধু শিল্পী হিসেবেই নয়, কলকাতার প্রতি তাঁর গভীর টান নিয়েও বহুবার কথা বলেছেন তিনি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের নানা অজানা স্মৃতি ভাগ করে নিতে গিয়ে কলকাতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, প্রেম, পরিবার এবং সাফল্যের গল্প নতুন করে তুলে ধরেছেন। তাঁর কথায়, এই শহর শুধু তাঁকে জনপ্রিয়তা দেয়নি, বদলে দিয়েছে গোটা জীবন।
সাক্ষাৎকারে ঊষা উত্থুপ জানান, প্রথমবার কলকাতায় গান গাইতে এসে তিনি কল্পনাও করেননি যে এই শহরই একদিন তাঁর স্থায়ী ঠিকানা হয়ে উঠবে। এখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় ভবিষ্যতের স্বামী জানি উত্থুপের। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে ভালোবাসায় বদলে যায়। শিল্পীর কথায়, “আমি এখানে এসে আমার স্বামীকে খুঁজে পেয়েছিলাম। একজন ভারতীয় স্ত্রীর মতো স্বামীর সঙ্গে যেখানে থাকার কথা, সেখানেই থেকেছি। তারপর দেখতে দেখতে কলকাতাই আমাকে আপন করে নিয়েছে।” তিনি আরও বলেন, আজ এত বছর পর এই শহর শুধু তাঁর বাসস্থান নয়, তাঁর পরিচয়েরও বড় অংশ হয়ে উঠেছে।
কলকাতার প্রতি নিজের ভালোবাসার কথাও অকপটে জানিয়েছেন ঊষা। তাঁর কপালের বিখ্যাত ‘ক’ অক্ষরের টিপের প্রসঙ্গ উঠতেই শিল্পী বলেন, এটি শুধুই একটি সাজ নয়। প্রতিদিন কপালে সেই টিপ পরে তিনি যেন কলকাতাকেই নিজের সঙ্গে বহন করেন। তাঁর ভাষায়, এই শহর তাঁকে ভালোবাসা, গান, অসংখ্য স্মৃতি এবং জীবনের নতুন অর্থ দিয়েছে। একই সঙ্গে নিজের জন্মশহর চেন্নাইয়ের কথাও স্মরণ করেন তিনি। ঊষা বলেন, চেন্নাই তাঁকে শিকড় দিয়েছে, আর কলকাতা তাঁকে ডানা মেলে উড়তে শিখিয়েছে। এই দুই শহরের জন্যই তাঁর জীবনের পথচলা এত সমৃদ্ধ হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে নিজের দীর্ঘ সঙ্গীতজীবন নিয়েও কথা বলেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী। তিনি জানান, আজও তিনি নিজেকে প্রথমে একজন নাইটক্লাব গায়িকা হিসেবেই ভাবতে ভালোবাসেন। সেই পরিচয় নিয়েই তিনি গর্বিত। সময়ের সঙ্গে গানের ধরণ বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু গানকে ভালোবাসার অনুভূতি একটুও বদলায়নি। তাঁর মতে, একজন শিল্পীর কাছে গান সবসময় শিল্পীর থেকেও বড়। তাই প্রতিটি মঞ্চে নতুনভাবে নিজেকে তৈরি করতে হয়। এই বিশ্বাসই তাঁকে এত দীর্ঘ সময় ধরে শ্রোতাদের ভালোবাসার জায়গায় ধরে রেখেছে।
ঊষা উত্থুপের কথায় বারবার উঠে এসেছে ভালোবাসার গুরুত্ব। তিনি মনে করেন, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঘটনাগুলোর পিছনে রয়েছে ভালোবাসাই। সেই ভালোবাসা যেমন তাঁকে পরিবারের সঙ্গে যুক্ত করেছে, তেমনই শ্রোতাদের সঙ্গেও অটুট সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। কলকাতার মানুষ তাঁকে যেভাবে গ্রহণ করেছেন, তার জন্য তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন। তাঁর এই আবেগঘন স্বীকারোক্তি আবারও প্রমাণ করে, একজন শিল্পীর জীবনে কোনও কোনও শহর শুধুমাত্র কর্মক্ষেত্র হয়ে থাকে না, বরং হয়ে ওঠে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আজও মঞ্চে সমান উদ্যমে গান গেয়ে চলেছেন ঊষা উত্থুপ। নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি সমান জনপ্রিয়। সাম্প্রতিক এই সাক্ষাৎকারে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের যে আবেগঘন অধ্যায় সামনে এসেছে, তা অনুরাগীদের আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছে কেন তিনি শুধু একজন গায়িকা নন, বরং বহু মানুষের অনুপ্রেরণা। কলকাতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, স্বামীকে খুঁজে পাওয়ার গল্প এবং এই শহরের প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ইতিমধ্যেই বহু মানুষের মন ছুঁয়ে গেছে।
