২০১৭ সালের কথা। তখন আমি ইতিমধ্যেই কিছু গান গেয়ে ফেলেছি এবং কলকাতায় একটু একটু করে পরিচিতিও তৈরি হয়েছে। সেই সময় আচমকাই একটি ফোন আসে, যা আমার জীবনের এক বিশেষ মুহূর্ত হয়ে আছে। পরে জানতে পারি, সুরকার জয় সরকার আমার নাম শ্রেয়া ঘোষালকে জানিয়েছিলেন। সেখান থেকেই প্রথম আলাপ। প্রথম দিকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ হয়নি, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝে গিয়েছিলাম মানুষটা কতটা সরল এবং আন্তরিক। মঞ্চে যেভাবে দর্শকদের সামনে নিজেকে তুলে ধরেন, বাস্তব জীবনেও তিনি ঠিক ততটাই স্বাভাবিক এবং বিনয়ী। প্রায় নয় বছর ধরে তাঁকে কাছ থেকে দেখছি, আর প্রতিদিনই নতুন করে কিছু শেখার সুযোগ পাই।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের দূরত্ব ধীরে ধীরে কমে গেছে। এখন মনে হয় আমি যেন তাঁর পরিবারেরই একজন সদস্য। পরিবার ছাড়া তাঁর কাছে আর কোনও কিছু এত গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটা এত দিনে ভালোভাবেই বুঝেছি। ভুল করলে তিনি ধমকও দেন, আবার প্রয়োজন হলে ভালোবাসা দিয়ে পাশে থাকেন। এই ধমক পাওয়াটাও আমার কাছে আলাদা আনন্দের, কারণ তখনই বুঝতে পারি তিনি আমাকে নিজের মানুষের মতোই দেখেন। তাঁর মধ্যে কোনও ভান বা মেকি ভাব নেই। এই সহজ স্বভাবই তাঁকে আরও বড় করে তোলে আমার কাছে। একজন শিল্পী হিসেবে তো তিনি অনুপ্রেরণা, পাশাপাশি একজন মানুষ হিসেবেও তিনি আমাকে প্রতিদিন নতুন করে অনুপ্রাণিত করেন।
করোনার সময়ের পর থেকে আমাদের সম্পর্ক আরও পারিবারিক হয়ে উঠেছে। তাঁর কাছ থেকে অনেক বড় বড় সুযোগ পেয়েছি। সেই সুযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় ছিল আমেরিকার ডলবি থিয়েটারে অনুষ্ঠান করার সুযোগ। সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা আজও আমার মনে স্পষ্ট। সেই দিনটির কথা ভাবলেই এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। পরে আবার সুরকার প্রীতমের সঙ্গেও সেখানে আরেকটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এই সব অভিজ্ঞতা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র শ্রেয়াদির উৎসাহ এবং বিশ্বাসের জন্য। তাঁর মতো একজন বড় শিল্পীর পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করা আমার কাছে সত্যিই গর্বের।
মঞ্চে অনুষ্ঠান করার সময় আমরা সবাই খুব পেশাদার থাকি। কিন্তু রিহার্সালের সময় পুরো পরিবেশটাই হয়ে যায় অনেক বেশি আনন্দের এবং প্রাণবন্ত। আমরা একসঙ্গে হাসি মজা করি এবং সময়টা উপভোগ করি। এখন তো মাঝে মাঝেই আমাদের সঙ্গে আসে শ্রেয়াদির ছেলে দেবযান। ড্রাম দেখলেই সে দৌড়ে গিয়ে বাজাতে চায়। ছোট্ট দেবযানের সেই উৎসাহ আমাদের সবার মন ভালো করে দেয়। আর শ্রেয়াদির আরেকটা মজার দিক হল তিনি খেতে খুব ভালোবাসেন। যদিও তিনি প্রবাসে বড় হয়েছেন, তবু তাঁর খাবারের পছন্দ অনেকটাই পূর্ববঙ্গের মানুষের মতো। ঝাল ঝাল খাবারের প্রতি তাঁর আলাদা ভালোবাসা রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ রাজনন্দিনীর স্মৃতিতেই অপর্ণার ভ’য়ঙ্কর পরিবর্তন, অচেনা রূপে আর্য স্তব্ধ! আতঙ্কে পালাতে গিয়েই ঘটে গেল অঘটন! ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’এ এবার আর্যর প্রাণ সংশয়! অপর্ণা কি পারবে রক্ষা করতে?
একবার আমরা আগরতলায় অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানে আমার এক পরিচিত মানুষ আমার জন্য সিদল শুঁটকি রান্না করে বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন। খবরটা শ্রেয়াদির কানে যেতেই তিনি খুব উৎসাহ নিয়ে সেটি চেখে দেখতে চাইলেন। আমি ঝাল বেশি হওয়ায় ঠিকমতো খেতে পারিনি, কিন্তু তিনি বেশ আনন্দ নিয়ে চেটেপুটে খেয়ে নিলেন। এই ঘটনাটা আজও মনে পড়লে হাসি পায়। রিহার্সালের সময় তাই আমাদের খাওয়া দাওয়াও কম হয় না। মুম্বইয়ের রাস্তার নানা রকম চটপটে খাবার তখন তালিকায় থাকে। তবে কখনও যদি তাঁকে খুব গম্ভীর মনে হয়, তখন আমরা কেউ তাঁকে বিরক্ত করি না। বিশেষ করে দেবযানের জন্মের পরে তাঁর মধ্যে মাতৃত্বের এক অন্যরকম কোমলতা লক্ষ্য করেছি। তাঁর জন্মদিনে আমার একটাই ইচ্ছে, আমাদের এই সুন্দর সম্পর্ক যেন সব সময় এমনই অটুট থাকে।
