বলিউডের নতুন ছবি ‘ভূত বাংলা’র একটি গান ঘিরে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। ‘রামজি আকে ভলা করেঙ্গে’ নামের এই গানের কয়েকটি লাইন শুনে অনেকেরই মনে পড়েছে সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী ছবি গুপী গাইন বাঘা বাইন (Goopy Gyne Bagha Byne) -এর বিখ্যাত গান ‘ভূতের রাজা দিল বর’। বিশেষ করে ‘কালা ভূত গোরা ভূত, লম্বা ভূত ছোটা ভূত’ ধরনের অংশ শ্রোতাদের কাছে খুবই পরিচিত মনে হয়েছে। নকলের অভিযোগ ওঠার আগেই সুরকার প্রীতম চক্রবর্তী সমাজ মাধ্যমে জানিয়ে দেন, গানটি আসলে শ্রদ্ধার নিদর্শন। তাঁর কথায় পরিচালক প্রিয়দর্শন এবং অভিনেতা অক্ষয় কুমার এই গানটি কিংবদন্তি নির্মাতাকে উৎসর্গ করতেই তৈরি করেছেন।
তবু প্রশ্ন উঠেছে, কোনও সৃষ্টিকে উৎসর্গ করার নামে কতটা মিল থাকলে তা গ্রহণযোগ্য থাকে। এই বিতর্ক নতুন নয়। সঙ্গীতের জগতে অনুপ্রেরণা এবং নকলের সীমারেখা বহু দিন ধরেই অস্পষ্ট। ‘ভূত বাংলা’র গানটি গেয়েছেন বাঙালি শিল্পী। তাঁর দাবি, শুরু থেকেই পরিকল্পনা ছিল এটি একটি ট্রিবিউট হবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আসল গান এবং নতুন গানের স্বরলিপি ও স্কেলে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। মন দিয়ে শুনলে বোঝা যায় দুটি গানের সুরের গঠন এক নয়। তবু শ্রোতাদের একাংশের মতে মিল এতটাই বেশি যে সেটিকে নিছক অনুপ্রেরণা বলা কঠিন। আবার অন্য এক অংশ মনে করছেন, জনপ্রিয় পুরনো কাজকে সম্মান জানাতেই এমন ব্যবহার করা হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে সঙ্গীত পরিচালক বলেন, কতটা মিল থাকলে তাকে চুরি বলা হবে তার নির্দিষ্ট হিসাব নেই। তাঁর মতে গানের পেছনের উদ্দেশ্যটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজেও ভবিষ্যতের ভূত ছবিতে একটি গানে ভূতের চরিত্র ব্যবহার করে সত্যজিৎ রায়ের কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য, প্রিয় শিল্পীর কাজ থেকে প্রভাব নেওয়া স্বাভাবিক এবং অনেক সময় তা সৃষ্টির আনন্দই বাড়িয়ে দেয়। তাই এই গানটিকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নকল বলে মনে করেননি। বরং এটিকে অনুপ্রেরণারই একটি প্রকাশ হিসেবে দেখছেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ মাটির তলায় বন্দী রায়ান-পারুল, মাথা দিয়ে গলফ খেলছে সংযুক্তা! ‘পরিণীতা’র ভাইরাল দৃশ্যের নেপথ্যে অবাক করা কাহিনি, শুনলে অবাক হবেন আপনিও!
তবে কপিরাইটের প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাইবার আইনজীবী জানান, অনুমতি ছাড়া কোনও গান নতুন করে প্রকাশ করা হলে সেটি কপিরাইট লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হতে পারে। যদিও কোনও গানের কপিরাইটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তা নিয়ে নতুন কাজ করা সম্ভব। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণত স্বত্বাধিকারীর অনুমতি নেওয়াই নিয়ম। এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে সন্দীপ রায় জানান, এই গানের জন্য তাঁদের কাছ থেকে আলাদা করে অনুমতি নেওয়া হয়নি। তবে মাত্র কয়েকটি লাইন ব্যবহার হওয়ায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে এটিকে ট্রিবিউট হিসেবেই দেখছেন।

সঙ্গীত জগতে এমন বিতর্ক আগেও বহুবার হয়েছে। অনেক বিখ্যাত সুরকারের গান নিয়েই নকলের অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ এটিকে স্যাম্পলিং বলেন, যেখানে পুরনো সৃষ্টির একটি অংশ নতুন রচনায় ব্যবহার করা হয়। পরিচালক কৌশিক মুখোপাধ্যায় মনে করেন, স্যাম্পলিং সঙ্গীতের বহু পুরনো পদ্ধতি এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গীত থেকেই শিল্পীরা নতুন সৃষ্টি গড়ে তুলেছেন। অন্যদিকে সুরকার জয় সরকারের মতে, আসল পার্থক্যটি সৃজনশীলতায়। যদি কোনও গানে নিজস্বতা থাকে এবং মূল স্রষ্টাকে সম্মান জানানো হয়, তবে তা উৎসর্গ হিসেবেই ধরা যেতে পারে। কিন্তু সেই সীমা কোথায় শেষ হয়, তা নিয়েই আজও বিতর্ক চলছেই।
