বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীতজগতের এক অনন্য নাম সলিল চৌধুরী (Salil Chowdhury)। সুরকার, গীতিকার, সংগীত পরিচালক— একাধিক পরিচয়ে তিনি সমান উজ্জ্বল ছিলেন। তাঁর সৃষ্টি আজও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করে। বাবার জন্মশতবার্ষিকীর প্রেক্ষিতে তাঁর স্মৃতি, মানুষ হিসেবে তাঁর সরলতা এবং ব্যক্তিজীবনের নানা অজানা মুহূর্ত নিয়ে আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেছেন কন্যা অন্তরা চৌধুরী (Antara Chowdhury)। বাবার চলে যাওয়ার তিন দশক পরেও সেই শূন্যতা যে এখনও তীব্র, তা স্পষ্ট তাঁর কথাতেই।
অন্তরা জানিয়েছেন, বাবার মৃত্যুতে দীর্ঘ ৩০ বছরের শূন্যতা তৈরি হয়েছে জীবনে। সেই শূন্যতা আর কোনও দিন পূরণ হবে না বলেই মনে করেন তিনি। তাই বাবার সঙ্গীতকেই জীবনের ভরসা করে এগিয়ে চলেছেন। জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার প্রস্তুতি নিতে গিয়েই বারবার মনে পড়েছে বাবার কথা। শিল্পীদের সঙ্গে রিহার্সাল করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন, মানুষের মধ্যে এখনও সলিল চৌধুরীর গান নিয়ে কত আগ্রহ ও আবেগ রয়েছে। তাঁর কথায়, বাবার সঙ্গীতই যেন তাঁকে মানুষের মাঝে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে।
অন্তরার স্মৃতিতে বাবা ছিলেন একেবারেই সহজ মানুষ। বাড়িতে তিনি কখনও বড় সুরকারের মতো আচরণ করতেন না। বরং মেয়েকে ‘মানু’ বলে ডাকতেন এবং ছোট ছোট নিত্যদিনের মুহূর্তেই তৈরি হতো তাদের সম্পর্কের উষ্ণতা। কখনও বাড়ি ফিরে মেয়েকে বলছেন পাকা চুল দেখা যাচ্ছে কি না, আবার কখনও সারাদিন কাজের পর ক্লান্ত পায়ের ওপর দাঁড়াতে বলছেন। সেইসব সাধারণ মুহূর্তেই ধরা পড়ত বাবার সহজ স্বভাব। অনেক পরে সিনেমা হলে গিয়ে যখন ‘রজনীগন্ধা’ বা ‘ছোটি সি বাত’ ছবির পর্দায় বাবার নাম দেখতেন, তখনই প্রথম বুঝতে শুরু করেন— তাঁর বাবা আসলে কত বড় মাপের শিল্পী।
ছোটবেলা থেকেই সংগীতের পরিবেশে বড় হয়েছেন অন্তরা। বাড়িতে প্রায়ই আড্ডা দিতে আসতেন কিংবদন্তি শিল্পীরা— যেমন মান্না দে, আশা ভোঁসলে, লতা মঙ্গেশকর-এর মত প্রমুখ ব্যক্তিরা। সাত বছর বয়সে ‘মিনু’ ছবিতে গান গেয়ে তাঁর সংগীতজীবনের শুরু। সেই প্রথম জনপ্রিয় গান “বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে…” রেকর্ড করার দিন বাবার আনন্দের কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে তাঁর। রেকর্ডিং শেষ হতেই মেয়েকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন সলিল চৌধুরী— সেই স্মৃতিই যেন আজও তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আরও পড়ুনঃ ফের বড় পর্দায় ফিরছেন সৌমিতৃষা! রহস্যের জাল খুলতে, কোন নতুন গল্পে ধরা দেবেন অভিনেত্রী? বিপরীতে নায়ক হিসেবে থাকছেন কে?
অন্তরা আরও জানান, কাজের প্রতি বাবার নিষ্ঠা ছিল অবিশ্বাস্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পিয়ানোয় বসে সুর তৈরি করতেন। পাশাপাশি পরিবারকেও সমান গুরুত্ব দিতেন। সংগীতের পাশাপাশি পড়াশোনা, শৃঙ্খলা, নিয়মিত রেওয়াজ— সব কিছুর উপরেই জোর দিতেন তিনি। পশ্চিমী ধ্রুপদী সঙ্গীত থেকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত— সব কিছু শুনে শেখার পরামর্শ দিতেন মেয়েকে। জীবনের শেষ পর্বে কাজের অভাব, মানসিক হতাশা— সবই এসেছে তাঁর জীবনে, তবুও কখনও ভেঙে পড়েননি। বরং নিজের ডায়েরিতে লিখে গিয়েছিলেন এক দৃঢ় বিশ্বাস— “আজ হয়তো সবাই আমাকে বুঝতে পারছে না, কিন্তু আমি চলে যাওয়ার ৫০ বছর পরেও আমাকে নিয়ে আলোচনা হবে।” বাবার সেই বিশ্বাসই আজ সত্যি হয়ে উঠছে বলেই মনে করেন অন্তরা।
