জয়েন গ্রুপ

বাংলা সিরিয়াল

এই মুহূর্তে

“‘আমি কোনদিনও কাউকে ফোন করে কাজ চাইনি, বাবার থেকে মাথা উঁচু করেই বাঁচতে শিখেছি’ সুপারহিট ছবি দেওয়ার পরও কেন আজ আর পর্দায় দেখা যায় না রীনা চৌধুরীকে? নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মানসিকতা, ইন্ডাস্ট্রির বদল নিয়ে মুখ খুললেন অঞ্জন চৌধুরীর কন্যা

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় নির্মাতা অঞ্জন চৌধুরী-র কন্যা অভিনেত্রী ও পরিচালক রীনা চৌধুরী সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয় জীবন, ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞতা এবং বাবাকে ঘিরে নানা অজানা স্মৃতি তুলে ধরেন। ছোটবেলা থেকেই সিনেমার পরিবেশে বড় হওয়া রীনার কাছে স্টুডিও ছিল যেন নিজের বাড়ির মতোই। তিনি জানান, অভিনয়ে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল একেবারে খেলতে খেলতেই। অঞ্জন চৌধুরীর ঐতিহাসিক ছবি ‘শত্রু’-তে প্রসেনজিতের বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। সেই সময় তিনি বুঝতেই পারেননি যে তিনি আসলে সিনেমার শুটিং করছেন। ক্যামেরা কোথায়, দৃশ্য কীভাবে ধারণ হয়, সেসবের কোনও ধারণাই ছিল না তাঁর। বাবার নির্দেশে শুধু ডায়লগ বলে গিয়েছিলেন, আর সেই খেলাচ্ছলেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা সিনেমার এক পরিচিত মুখ।

রীনা চৌধুরী জানান, তাঁদের বাড়ির পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। যেখানে অনেক পরিবারে সিনেমার পত্রিকা পড়া নিষিদ্ধ ছিল, সেখানে তাঁদের বাড়িতে নিয়মিত আসত আনন্দলোকের মতো ম্যাগাজিন। ছোটবেলা থেকেই প্রতি শুক্রবার নতুন ছবি দেখতে যাওয়া ছিল তাঁদের অভ্যাস। বাংলা হোক বা হিন্দি সব ধরনের ছবিই দেখতেন তাঁরা। তাঁর কথায়, “ছবি দেখার অভ্যাসটা বাবার থেকেই এসেছে। এখনও আমি প্রতিদিন তিন-চারটে করে ওটিটি কনটেন্ট দেখি।” অভিনয়ের পাশাপাশি নাচও করতেন তিনি। তবে অঞ্জন চৌধুরী প্রথম থেকেই মেয়েদের পড়াশোনাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ না করে অভিনয়ে পুরোপুরি নামতে দেননি। পরে ‘গীত সংগীত’, ‘পূজা’, ‘মেজবউ’, ‘আব্বাজান’-এর মতো একাধিক জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করেন রীনা।

তবে এত সাফল্যের পরেও কেন তাঁকে পরবর্তী সময়ে বড় পর্দায় খুব বেশি দেখা যায়নি, সেই প্রশ্ন উঠতেই রীনা চৌধুরীর গলায় শোনা গেল আক্ষেপের সুর। তিনি স্পষ্টই বলেন, তাঁর বাবা এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি নিজের অ্যাসিস্ট্যান্টদের পরিচালক বানিয়েছিলেন। বাবলু সমাজদার, হরনাথ চক্রবর্তীর মতো বহু পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর হাত ধরেই উঠে এসেছেন। কিন্তু পরে সেই পরিচালকদের ছবিতে তাঁকে বা তাঁর দিদি চুমকি চৌধুরীকে খুব একটা দেখা যায়নি। যদিও এই নিয়ে প্রকাশ্যে কখনও অভিযোগ করেননি রীনা। তাঁর কথায়, “আমরা কাউকে কখনও ফোন করে কাজ চাইনি। যদি কেউ নিজে ডেকে বলে, তবেই কাজ করব। আমি এমন একজন পিতার সন্তান, যেখানে মাথাটা খুব উঁচু থাকে।” তিনি আরও বলেন, তাঁরা যা পেয়েছেন তাতেই খুশি। মানুষের ভালোবাসাই তাঁদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

ইন্টারভিউতে বারবার উঠে এসেছে অঞ্জন চৌধুরীর উদারতা ও মানবিকতার কথা। রীনা জানান, এমনও হয়েছে যে কোনও প্রযোজক তাঁর বাবাকে বলেছেন, “আপনি ডিরেক্টর হলে তবেই ছবি প্রযোজনা করব।” কিন্তু অঞ্জন চৌধুরী নিজের অ্যাসিস্ট্যান্টদের সুযোগ করে দিতে নিজে প্রযোজক হয়ে গিয়েছেন, অথচ পরিচালনার আসনে বসিয়েছেন অন্য কাউকে। রীনার কথায়, “এই মানবিকতা সবাইয়ের মধ্যে থাকে না। এটা কাউকে শেখানো যায় না।” সেই কারণেই ইন্ডাস্ট্রির প্রতি তাঁর কোনও অভিমান নেই। তিনি মনে করেন, যাঁদের কৃতজ্ঞতা বোধ আছে, তাঁরা নিজে থেকেই সম্মান দেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তী-র প্রসঙ্গও তোলেন। যদিও হরনাথ অঞ্জন চৌধুরীর সরাসরি অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন না, তবু গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই তাঁর প্রায় সব ছবিতে রীনাকে নিয়েছেন।

অভিনয়ের পাশাপাশি যাত্রা মঞ্চেও দীর্ঘ ২৪ বছর কাজ করেছেন রীনা চৌধুরী। তিনি জানান, হাজার হাজার দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে সংলাপ বলা এবং সরাসরি হাততালি পাওয়ার অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। বিশেষ করে ‘নটি বিনোদিনী’ যাত্রাপালায় অভিনয় তাঁর জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। সেখানে সমস্ত পুরুষ চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন মহিলারাই। রীনা বলেন, তাঁর বাবা সেই অভিনয় দেখে আবেগে কেঁদে ফেলেছিলেন। শুধু অভিনয় নয়, বর্তমানে পরিচালনা ও চিত্রনাট্য লেখাতেও ব্যস্ত তিনি। ইতিমধ্যেই তিনটি ছবি পরিচালনা করেছেন রীনা চৌধুরী। তাঁর প্রথম ছবি ‘কল্পতরু’ ফিল্মফেয়ার মনোনয়নও পেয়েছিল। এছাড়া ‘ছায়া সূর্য’ এবং ‘সোহাগরাজ’-এর মতো ছবিও পরিচালনা করেছেন তিনি। নতুন ছবির কাজও শুরু করতে চলেছেন খুব শীঘ্রই।

সাক্ষাৎকারে বর্তমান প্রজন্ম নিয়েও নিজের মতামত দেন রীনা চৌধুরী। তাঁর মতে, মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের ধৈর্য কমিয়ে দিয়েছে। তাঁদের প্রজন্ম মোবাইল ছাড়াও কীভাবে আনন্দ করতে হয় জানত, কিন্তু এখনকার প্রজন্ম সেই সময় দেখেনি। ফলে সবকিছুতেই দ্রুততার প্রবণতা বেড়েছে। একইসঙ্গে তিনি জানান, এখনও তাঁর অভিনয় করার ইচ্ছা রয়েছে, তবে কাজটা ঠিকমতো না হলে তিনি করবেন না। পাশাপাশি বাবার বহু অপ্রকাশিত স্ক্রিপ্ট নিয়েও ভবিষ্যতে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। বিশেষ করে ‘পাখি’ নামে একটি চিত্রনাট্যের কথা বলেন রীনা, যেটি একসময় উত্তম কুমার এবং সুচিত্রা সেন-কে ভেবেই লেখা হয়েছিল। সেই স্বপ্নের ছবিকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনার কথাও ভাবছেন তিনি ও তাঁর দিদি।

Piya Chanda

                 

You cannot copy content of this page