সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হওয়া এক তীব্র বাকযুদ্ধ এখন টলিপাড়ার অন্যতম বড় চর্চার বিষয়। অভিনেতা জিতু কমল(Jeetu Kamal) এবং সাংসদ-অভিনেত্রী সায়নী ঘোষ (Sayani Ghosh)-এর মধ্যে চলা এই প্রকাশ্য সংঘাত ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক এবং পেশাগত আক্রমণের রূপ নিয়েছে। একসময় যাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন, পর্দায় ‘অপরাজিত’ ছবিতে সত্যজিৎ ও বিজয়া রায়ের চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসাও কুড়িয়েছিলেন, সেই দুই তারকার সম্পর্ক এখন কার্যত তলানিতে। ফেসবুক পোস্ট, কটাক্ষ, পাল্টা অভিযোগ এবং মধ্যরাতের লাইভ সব মিলিয়ে এই বিতর্ক ঘিরে সরগরম গোটা বিনোদন জগত।
এই ঝামেলার সূত্রপাত পুরনো এক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে। কয়েক বছর আগে বিরাটিতে জিতু কমল এবং তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী নবনীতা দাসকে হেনস্থার অভিযোগে ব্যাপক শোরগোল তৈরি হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গ টেনেই প্রথমে সায়নী ঘোষ জিতুকে আক্রমণ করেন। তাঁর দাবি, সেই সময় থানায় গিয়ে জিতু ‘আমি কে জানেন?’ ধরনের আচরণ করেছিলেন এবং ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত নাটক তৈরি করেছিলেন। সায়নী আরও লেখেন, জিতু এখন ‘স্রোতে গা ভাসিয়ে’ বিভিন্ন মন্তব্য করছেন এবং নিজেকে অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন। এমনকি তিনি জিতুকে ‘টলিউডের কঙ্গনা রানাওয়াত’ বলেও কটাক্ষ করেন। তাঁর অভিযোগ, সফলতা পাওয়ার পর জীতুর আচরণ বদলে গিয়েছে এবং ইন্ডাস্ট্রির বহু মানুষ তাঁর ব্যবহার নিয়ে অসন্তুষ্ট।
এরপরই গভীর রাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘ পোস্ট ও লাইভে এসে পাল্টা জবাব দেন জীতু কমল। তিনি দাবি করেন, সায়নী সাহায্য করেননি, বরং তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন যাতে ঘটনাটিকে সাধারণভাবে দেখা হয়। নিজের প্রাক্তন স্ত্রী নবনীতার প্রসঙ্গ টেনে জিতু প্রশ্ন তোলেন, “নবনীতা ফোন না ধরতেই আপনি কীভাবে জানলেন যে সে আমার কুকর্ম জানাতে ফোন করেছিল?” তিনি আরও দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হচ্ছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। জিতু নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বলেন, তিনি “ওয়ান ওম্যান ম্যান” এবং কোনও মহিলাকে অসম্মান করেছেন এমন প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর ট্যাক্সের টাকাতেই সাংসদদের বেতন হয়, তাই জনগণের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তাঁদের দায়িত্ব। পোস্টের শেষে একটি ব্যঙ্গাত্মক গান জুড়ে দিয়ে তিনি রাজনৈতিক খোঁচাও দেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ফের বিস্ফোরক প্রতিক্রিয়া দেন সায়নী ঘোষ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, জিতুর মন্তব্যের আর উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন তিনি মনে করেন না। তবে সেই পোস্টেই একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলেন অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে। সায়নীর দাবি, প্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয়ের মৃত্যুর পর আয়োজিত শোকমিছিলে জীতু শোক প্রকাশের চেয়ে বেশি মিডিয়ার সামনে নিজেকে তুলে ধরতেই ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর কথায়, “এমন স্বার্থপর এবং সুবিধাবাদী মানুষের অবান্তর মন্তব্যের আর উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই।”
সায়নী আরও লেখেন, ইন্ডাস্ট্রিতে জিতুর বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। সহ-অভিনেত্রীদের সঙ্গে অনুপযুক্ত আচরণ, প্রযোজক ও কলাকুশলীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, সিনিয়র-জুনিয়র শিল্পীদের অসম্মান করা এবং পারিশ্রমিক সংক্রান্ত নানা বিতর্কের কথা উল্লেখ করেন তিনি। যদিও কোনও নির্দিষ্ট ঘটনার প্রমাণ তিনি পোস্টে দেননি, তবু তাঁর দাবি, টলিপাড়ার অন্দরে এসব অভিযোগ বহুবার শোনা গিয়েছে। তাই নীতি-নৈতিকতা নিয়ে জীতুর বক্তৃতা দেওয়াকে তিনি “ভণ্ডামি” বলেই ইঙ্গিত করেন।
বিরাটির সেই পুরনো ঘটনার প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন সায়নী। তিনি জানান, ২০২২ সালে জীতু এবং তাঁর প্রাক্তন স্ত্রীকে হেনস্থার ঘটনায় চারজন গ্রেফতার হয়েছিল এবং এক পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধেও বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছিল। সেই সময় মানবিক জায়গা থেকে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। কিন্তু এখন সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর নাম টেনে আনা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করাকে তিনি অপমানজনক বলেই মনে করছেন।
সবচেয়ে কড়া আক্রমণ আসে জিতুর আত্মপ্রচার প্রসঙ্গে। সায়নী লেখেন, জিতু নিজেকে “স্বঘোষিত সত্যজিৎ রায়” ভাবতে শুরু করেছেন এবং বাস্তবের গ্রহণযোগ্যতা ও নিজের প্রচারের সীমারেখা গুলিয়ে ফেলছেন। তাঁর মতে, জিতুর সাম্প্রতিক পোস্ট ও রাতের লাইভ আসলে “সস্তা নাটক” এবং “ডেসপারেশন”-এর বহিঃপ্রকাশ। এমনকি তিনি ব্যঙ্গ করে লেখেন, “পুরোটাই লুজ প্লট, সস্তার স্ক্রিপ্ট এবং খারাপ অভিনয়ের ওপর দিয়ে চলছে।”
এই বিতর্ক এখন শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গায় আটকে নেই, বরং রাজনৈতিক রংও পেতে শুরু করেছে। কারণ জিতু কমল দীর্ঘদিন ধরেই বামপন্থী মতাদর্শের সমর্থক হিসেবে পরিচিত, অন্যদিকে সায়নী ঘোষ তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম মুখ। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই লড়াইকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ জিতুর পাশে দাঁড়াচ্ছেন, কেউ আবার সায়নীর বক্তব্যকে সমর্থন করছেন।
টলিপাড়ার অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন, এই প্রকাশ্য কাদা ছোড়াছুড়ি শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ের দিকে গড়াবে কি না। যদিও এখনও পর্যন্ত কেউ আইনি পদক্ষেপের কথা প্রকাশ্যে বলেননি, তবে একের পর এক ব্যক্তিগত অভিযোগ এবং পাল্টা আক্রমণে পরিস্থিতি যে ক্রমশ জটিল হচ্ছে, তা বলাই যায়।
