বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এখনও কাটেনি পরিচালক অনীক দত্তর মৃত্যুর ধাক্কা। ‘অপরাজিত’ ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের চরিত্রে অভিনয় করে যিনি সবচেয়ে বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন, সেই জিতু কামালও পরিচালকের প্রয়াণে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। ২৭ মে ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যু হয় অনীক দত্তর। প্রাথমিক ময়নাতদন্ত রিপোর্টে আত্মহত্যার ইঙ্গিত মিলেছে বলেই জানা গিয়েছে। যদিও পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। পরিচালকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই টলিপাড়ায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। সংবাদমাধ্যম বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও প্রথমে ফোনে পাওয়া যায়নি জিতুকে। হাসপাতালেও তিনি উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু কোনও মন্তব্য করতে চাননি। অবশেষে রাতে সমাজমাধ্যমে নিজের অনুভূতির কথা প্রকাশ করেন অভিনেতা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া পোস্টে সংবাদমাধ্যমের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন জিতু কামাল। তিনি লেখেন, “মিডিয়ার সমস্ত বন্ধু, দিদি, দাদা, ভাই, প্রত্যেকের কাছে আমি করজোরে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।” এরপরই তিনি জানান, এই ঘটনার পর তাঁর সত্যিই কিছু বলার মতো ভাষা নেই। জিতুর কথায়, “যে ঘটনা ঘটে গেছে তারপরে আমার কিছু বলার থাকতে পারে না এমনটা বলবো না। আমার সত্যিই কিছু বলার নেই, বিশ্বাস করুন। কী বলবো বলুন?” একই সঙ্গে পরিচালকের প্রতি নিজের কৃতজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। পোস্টে অভিনেতা লেখেন, “আমি অনীক দার কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। ওনার পরিবারে পাশে থাকুন আর কিছু বলার নেই।” সংবাদ মাধ্যমের কাজের চাপও তিনি বুঝতে পারছেন বলে জানান। তাঁর কথায়, “জানি আর বুঝিও বাইট বা কপি নেওয়াটা আপনাদেরও কাজ। আমাকে ক্ষমা করবেন। আপনাদেরও মন ভেঙেছে, আপনারাও বেদনাহত।”
এদিকে এসএসকেএম হাসপাতালে এদিন অনীক দত্তর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তারপর ফুলের স্তবক দিয়ে পরিচালককে শেষ শ্রদ্ধা জানান শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রুদ্রনীল ঘোষ, শতরূপ ঘোষ, উষসী চক্রবর্তী, বিদীপ্তা চক্রবর্তী-সহ আরও অনেকে। সূত্রের খবর, ময়নাতদন্তের পর পরিচালকের দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার ফলে শরীরের একাধিক জায়গায় গুরুতর আঘাত লাগে। বিশেষ করে মাথায় মারাত্মক চোটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকদের অনুমান। হাসপাতাল পৌঁছনোর আগেই অনীক দত্তর মৃত্যু হয়েছিল বলেও জানা গিয়েছে। তবে পুলিশ এখনও সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছে।
ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরীক্ষা করে দেখছে। যে ছাদ থেকে পরিচালক ঝাঁপ দিয়েছেন বলে অনুমান, সেটির উচ্চতা কত ছিল, পাঁচিল কতটা উঁচু ছিল, সেই সব তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে উপর থেকে পড়ার সময় অনীক দত্তর দেহ যে কাঁঠাল গাছে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে, সেই জায়গাটিও পরীক্ষা করা হবে। ছাদ এবং গাছের মধ্যের দূরত্বও মাপা হবে বলে জানা গিয়েছে। এর মধ্যেই সামনে এসেছে একটি সুইসাইড নোটের তথ্য। পুলিশের দাবি, ঘটনাস্থল থেকে একটি নোট উদ্ধার হয়েছে। সেই নোট দেখেই প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার সম্ভাবনার কথা মনে করা হচ্ছে। তবে এখনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না তদন্তকারী দল।
আরও পড়ুন : ‘ভেঙে পড়েছিল শরীর, কিন্তু কাজ ছাড়তে চাননি, বলতেন বসে বসে পরিচালনা করব!’ অনীকের মৃ’ত্যুতে ভেঙে পড়েছেন অভিনেতা আবির! পরিচালকের শেষ ছবির নায়ক হয়ে রয়ে গেলেন তিনি
এই বিষয়ে ডেপুটি কমিশনার সৈকত ঘোষ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “অস্বাভাবিক মৃত্যুর কেস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তদন্ত চলছে। আমরা ময়নাতদন্ত করাব। টিম এসে কিছু স্যাম্পেল সংগ্রহ করেছে। ফরেনসিক করানো হবে এই জায়গার।” সুইসাইড নোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একটা সুইসাইড নোট আমরা পেয়েছি, কিন্তু ওর ভিতরে কী আছে সেটা এখনই বলা যাবে না। আমরা সব দিক খতিয়ে দেখছি।” পুলিশ সূত্রে খবর, নোটটি ফরেনসিকে পাঠানো হবে হাতের লেখা যাচাই করার জন্য। সেটি সত্যিই অনীক দত্তর লেখা কি না, তা মিলিয়ে দেখা হবে। ফলে রহস্যমৃত্যুর এই ঘটনার পিছনে আসল কারণ কী, তা জানতে এখন তদন্তের রিপোর্টের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে টলিউড এবং পরিচালকের অনুরাগীরা।
