দীর্ঘ ১৫ বছরের রাজনৈতিক অধ্যায়ের পর পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার পালাবদল এখন শুধুমাত্র রাজনৈতিক মহলেই নয়, প্রভাব ফেলেছে টলিপাড়াতেও। ২০১১ সালে বাম জমানার অবসানের পর রাজ্যে শুরু হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের শাসন। সেই সময় বহু তারকাকে প্রকাশ্যে শাসকদলের পাশে দাঁড়াতে দেখা গিয়েছিল। কেউ দলীয় মঞ্চে গিয়েছেন, কেউ নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছেন, আবার কেউ সরাসরি রাজনীতিতেও যোগ দিয়েছেন। কিন্তু ২০২৬ সালে রাজ্যের মসনদে বিজেপি আসার পর সেই চেনা ছবিটাই বদলে যেতে শুরু করেছে। যাঁরা এতদিন প্রকাশ্যে তৃণমূলের সমর্থনে সরব ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন চুপ। আবার কেউ কেউ নতুন সরকারের প্রশংসা করতেও শুরু করেছেন। এই বদলে যাওয়া পরিস্থিতি নিয়েই এবার মুখ খুললেন অভিনেত্রী বিদিপ্তা চক্রবর্তী।
বাংলা সিনেমা এবং থিয়েটারের পরিচিত মুখ বিদিপ্তা চক্রবর্তী বরাবরই নিজের স্পষ্ট বক্তব্যের জন্য পরিচিত। তবে তাঁকে কখনও প্রকাশ্যে রাজনৈতিক প্রচারে দেখা যায়নি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং টলিউডের তারকাদের আচরণ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেন তিনি। বিদিপ্তার কথায়, রাজনৈতিক পালাবদল হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কোনও সরকারই চিরকাল ক্ষমতায় থাকে না। কিন্তু যেভাবে মানুষ এবং বিশেষ করে কিছু তারকাকে দ্রুত রাজনৈতিক রং বদলাতে দেখা যাচ্ছে, সেটাই তাঁকে ভাবাচ্ছে, নাম উল্লেখ না করলেও সাধারণ মানুষ ধারণা করেই নিয়েছে তিনি রাজ চক্রবর্তীর, দেব, অদিতি মুন্সির মতো ব্যক্তিদের কথাই বলেছেন। তিনি বলেন, আগে এসব দেখে অবাক লাগত, এখন আর অবাক হন না। বরং দূর থেকে সবটা দেখে মানুষকে চিনে রাখেন।
বিদিপ্তা আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি বরাবরই বামপন্থী আদর্শকে সমর্থন করেছেন। ছোটবেলা থেকে যে পরিবার ও পরিবেশে বড় হয়েছেন, সেখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক ভাবনার শুরু। ভোট দেওয়ার অধিকার পাওয়ার পর থেকেই তিনি বামপন্থী দলকেই সমর্থন করেছেন বলে স্বীকার করেন অভিনেত্রী। তবে এই রাজনৈতিক বিশ্বাসকে তিনি কখনও নিজের অভিনয়জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলেননি। কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রচারে যাননি, দলীয় মঞ্চেও দেখা যায়নি তাঁকে। তাঁর মতে, একজন শিল্পীর রাজনৈতিক সচেতনতা থাকা জরুরি, কিন্তু সরাসরি রাজনীতির মাঠে নেমে পড়া সবসময় ঠিক নয়। কারণ, তখন শিল্প এবং রাজনীতির সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিদিপ্তা সরাসরি অভিযোগ তোলেন, বিগত কয়েক বছরে টলিউডে এক ধরনের দাদাগিরি এবং পক্ষপাতিত্ব তৈরি হয়েছিল। তাঁর কথায়, যাঁদের রাজনীতি সম্পর্কে তেমন কোনও ধারণাই নেই, শুধু পরিচিত মুখ হওয়ার কারণে তাঁদের রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে শুধু শিল্পীদের দোষ দিলে হবে না বলেও মনে করেন তিনি। কারণ, সরকার পক্ষ থেকেই তাঁদের ডেকে আনা হয়েছিল। বিদিপ্তা বলেন, অনেকেই দাবি করেন, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাকলে না বলা যেত না। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন, কেন না বলা যেত না? তিনি নিজে কখনও সেই ডাকে সাড়া দেননি বলেও জানান অভিনেত্রী। এই প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সবটাই আসলে ব্যক্তিগত অবস্থান এবং রাজনৈতিক সচেতনতার উপর নির্ভর করে।
আরও পড়ুনঃ ‘মরলে পোস্ট না করে, বেঁচে থাকতে খোঁজ রাখুন!’ টলিপাড়ার মেকি সহানুভূতিতে বি’স্ফোরক রূপসা চক্রবর্তী! অনীক-রাহুল মৃ’ত্যুর আবহে কড়া বার্তা অভিনেত্রীর!
টলিউডের বর্তমান অবস্থা নিয়েও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বিদিপ্তা চক্রবর্তী। তাঁর দাবি, গত ১৫ বছরে ইন্ডাস্ট্রির পরিবেশ অনেকটাই খারাপ হয়েছে। কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। অভিনেত্রীর কথায়, এমন অনেক মানুষকে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসানো হয়েছে, যাঁদের সিনেমার সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই। শুধু তাই নয়, ইন্ডাস্ট্রিতে দালালি, পক্ষপাতিত্ব, শিল্পীদের বয়কট এবং ব্যান করার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেকেই পরিবর্তনের আশ্বাস দিচ্ছেন বলেও জানান বিদিপ্তা। তাঁর আশা, এবার শুধু কথায় নয়, বাস্তবেও সেই পরিবর্তন দেখা যাবে এবং শিল্পের জগৎ আবার সুস্থ পরিবেশ ফিরে পাবে।
