বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় পরিচালক অনীক দত্তর প্রয়াণে এখনও শোকস্তব্ধ টলিউড। কেওড়াতলা মহাশ্মশানে সম্পন্ন হল তাঁর শেষকৃত্য। শেষযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন টলিউডের বহু পরিচিত মুখ। প্রথমে নন্দনে এবং পরে এনটিওয়ান স্টুডিওতে শায়িত রাখা হয় পরিচালকের মরদেহ। সেখানে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন রুদ্রনীল ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়, জিৎ, সৌরসেনী মৈত্র, গৌতম ঘোষ, জীতু কামাল-সহ আরও অনেকে। আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয় যখন অনীক দত্তর নিজের মেয়ে বাবার শেষযাত্রায় গান গেয়ে তাঁকে বিদায় জানান। উপস্থিত ছিলেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুও। পরিচালককে শেষবার দেখতে ভিড় জমিয়েছিলেন চলচ্চিত্র জগতের বহু মানুষ।
অনীক দত্তর কেরিয়ারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল ‘অপরাজিত’। অস্কারজয়ী পরিচালক সত্যজিৎ রায়কে শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি এই ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অভিনেতা জিতু কমল। ছবিটি দর্শকমহলে ব্যাপক প্রশংসা পেলেও নানা বিতর্কের মুখেও পড়তে হয়েছিল পরিচালককে। বিশেষ করে নন্দনে ছবির প্রদর্শন ঘিরে সেই সময় তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এই ঘটনার পর থেকেই পরিচালক মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়েছিলেন বলে মনে করছেন ইন্ডাস্ট্রির একাংশ। অনীক দত্তর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কও ছিল জীতু কামালের। তাই পরিচালকের মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে বলেই জানান অভিনেতা।
এনটিওয়ান স্টুডিওর বাইরে দাঁড়িয়ে আবেগঘন গলায় জীতু কামাল বলেন, “মানসিকভাবে খুন করা হয়েছে মানুষটাকে।” তাঁর অভিযোগ, অনীক দত্তকে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপের মধ্যে রাখা হয়েছিল। জিতুর দাবি, পরিচালকের ছবি আটকে দেওয়া হয়েছিল, এমনকি প্রযোজকদেরও নাকি বলা হত যেন তাঁরা অনীক দত্তর সঙ্গে কাজ না করেন। অভিনেতার কথায়, “আমি সামনে থেকে দেখেছি কীভাবে ওনার উপর মানসিক অত্যাচার করা হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই তৎকালীন সরকারকে খুশি করতে গিয়ে অনীকদার বিরুদ্ধে কথা বলতেন।” জীতু আরও বলেন, একইভাবে তাঁর বিরুদ্ধেও নানা মন্তব্য করা হয়েছিল, তবে সেসব নিয়ে তিনি মাথা ঘামান না।
শুধু অভিযোগই নয়, এই ঘটনার পর ইন্ডাস্ট্রির পরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন জীতু কামাল। তাঁর কথায়, “পাপ-পুণ্য সব কিছুর হিসেব শেষ পর্যন্ত এই শ্মশানেই মিটে যায়।” তাই তিনি চান, প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ হোক। নতুন সরকারের কাছেও আবেদন জানান অভিনেতা, যাতে শিল্পীদের কাজ আর কোনও রাজনৈতিক কারণে আটকে না দেওয়া হয়। জীতুর আক্ষেপ, আজ যাঁরা অনীক দত্তর প্রশংসা করছেন, তাঁদের অনেকেই একসময় পরিচালকের সমালোচনা করেছিলেন। তিনি আরও জানান, ঘটনার আগের দিনও তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল অনীক দত্তর। সেই স্মৃতি এখনও তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ “আর একটু হলেই সব শেষ!” শুটিং ফ্লোরে আচমকা ঘটে গেল এমন ঘটনা, অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেলেন মনোজ ওঝা! আতঙ্কে টলিপাড়া, অভিজ্ঞতা শুনে শিউরে উঠছেন অনুরাগীরা!
এদিকে বিজেপি নেতা তথা অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষও অনীক দত্তকে নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, নন্দনের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে একসময় শুধুমাত্র রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ মানুষদের সিনেমাই গুরুত্ব পেত। সেই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন অনীক দত্ত। রুদ্রনীল জানান, ‘অপরাজিত’ নন্দনে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও সেই রাজনৈতিক পরিবেশেরই ফল। তবে বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অনীক দত্তকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসে আশ্বাস দিয়েছেন, ভবিষ্যতে কোনও শিল্পীর কাজ রাজনৈতিক কারণে আটকে রাখা হবে না। শুধু তাই নয়, অনীক দত্তর যেসব কাজ বিভিন্ন কারণে আটকে ছিল, সেগুলিও যথাযথ সম্মানের সঙ্গে দর্শকদের সামনে আনা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। ফলে পরিচালকের মৃত্যুর পর ফের একবার টলিউডে শিল্প ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
