বর্তমান সমাজে পারস্পরিক সম্মানবোধ, মূল্যবোধ এবং সম্পর্কের আন্তরিকতা নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন উঠতে দেখা যায়। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব মানুষের জীবনযাত্রাকে যেমন বদলে দিয়েছে, তেমনই বদলে দিয়েছে একে অপরের প্রতি আচরণের ধরনও। অনেকেই মনে করেন, নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে সম্মান প্রদর্শন করলেও অন্তরে সেই শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শিল্প-সংস্কৃতির জগতেও এই পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা নতুন নয়।
বাংলা গানের জগতে দীর্ঘদিন ধরে নিজের কণ্ঠের জাদুতে শ্রোতাদের মন জয় করে চলেছেন জনপ্রিয় গায়িকা জোজো। একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে তিনি নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন। তবে শুধুমাত্র সংগীত নয়, সমাজের নানা বিষয় নিয়েও মাঝেমধ্যেই খোলামেলা মতামত দিতে দেখা যায় তাঁকে। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বর্তমান সময়ের সামাজিক পরিবর্তন, মানুষের মানসিকতা এবং সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন তিনি। সম্প্রতি এমনই এক সাক্ষাৎকারে বর্তমান প্রজন্মের আচরণ ও সম্মানবোধ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন গায়িকা।
জোজোর মতে, আজকের দিনে অনেক তরুণ-তরুণীর মধ্যে আন্তরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব চোখে পড়ে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, সামনে উপস্থিত হলে অনেকেই অত্যন্ত ভদ্র ব্যবহার করেন এবং বড়দের প্রতি সম্মান দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই আচরণ অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। প্রকাশ্যে প্রশংসা বা শ্রদ্ধা প্রদর্শনের পর আড়ালে সম্পূর্ণ ভিন্ন মনোভাব দেখা যায় বলেই মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, এই দ্বিচারিতা বর্তমানে সমাজের একটি বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
গায়িকার দাবি, সম্মান প্রদর্শন শুধুমাত্র কিছু সৌজন্যমূলক শব্দ ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সম্মান আসে মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে। তিনি মনে করেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই দ্রুত সাফল্য অর্জনের দিকে বেশি মনোযোগী হলেও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা এবং বিনয় শেখার ক্ষেত্রে আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে বাহ্যিক ভদ্রতার আড়ালে অনেক সময় প্রকৃত মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায় না।
সাক্ষাৎকারে তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, তাঁর বেড়ে ওঠার সময় শিল্পী এবং প্রবীণ ব্যক্তিত্বদের প্রতি যে ধরনের শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখানো হতো, বর্তমান সময়ে সেই পরিবেশ অনেকটাই বদলে গিয়েছে। আগে নতুন প্রজন্ম অভিজ্ঞ শিল্পীদের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করত, তাঁদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিত। কিন্তু এখন অনেকেই সেই সুযোগ পেলেও তা গ্রহণ করতে আগ্রহী নয় বলে তাঁর মত। ফলে প্রজন্মের মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হচ্ছে বলেও তিনি মনে করেন।
আরও পড়ুনঃ “একজন পুরুষের নির্দেশ একবারেই মানা হয়, কিন্তু আমাকে একই কথা ১৫ বার বলতে হয়” বাবা নেই, বাড়ির দায়িত্ব কাঁধে, নারী হিসেবে সমাজের অন্যায় বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে অকপট তাপস কন্যা সোহিনী! আপনারাও কি তার সঙ্গে একমত?
তবে জোজো গোটা প্রজন্মকে একসঙ্গে বিচার করতে নারাজ। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এখনও অনেক তরুণ-তরুণী রয়েছেন যাঁরা মূল্যবোধ, সংস্কৃতি এবং শ্রদ্ধার গুরুত্ব বোঝেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সমাজে যে পরিবর্তন ঘটছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, প্রযুক্তি ও আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি মানবিকতা, সম্মানবোধ এবং সম্পর্কের আন্তরিকতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। না হলে আগামী দিনে সামাজিক সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
