সমাজ যতই আধুনিকতার কথা বলুক না কেন, এখনও অনেক ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষকে আলাদা চোখে দেখার প্রবণতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে সংসারের দায়িত্ব সামলানোর ক্ষেত্রে একজন পুরুষের কথা অনেক সময় সহজেই গুরুত্ব পায়, অথচ একই কথা কোনও মহিলা বললে তাকে বারবার বুঝিয়ে বলতে হয়। পরিবারের হাল ধরতে গিয়ে এমন নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন বহু নারী। সম্প্রতি সেই বাস্তবতার কথাই খোলাখুলি তুলে ধরলেন অভিনেত্রী সোহিনী পাল।
সোহিনী পাল হলেন প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ তাপস পালের একমাত্র মেয়ে। অভিনয় জগতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অনেক দিনের। ২০০৪ সালে লক্ষ্মীপত সিংহানিয়া একাডেমিতে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় অঞ্জন দত্ত পরিচালিত ইংরেজি ছবি ‘বো ব্যারাকস ফরেভার’-এর মাধ্যমে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপর বাংলা ছবিতেও নিজের পরিচিতি তৈরি করেন সোহিনী।
‘জ্যাকপট’, ‘অটোগ্রাফ’, ‘একটি মেয়ে তমসী’-সহ একাধিক বাংলা ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। পরবর্তীকালে মুম্বইয়ে গিয়ে হিন্দি ছবি ‘হাম তুম দুশমন দুশমন’-এ কাজ করেন। পাশাপাশি ‘চিড়িয়া ঘর’-এর মতো জনপ্রিয় হিন্দি ধারাবাহিকেও দেখা যায় তাঁকে। তবে ২০২০ সালে তাপস পালের আকস্মিক প্রয়াণের পর জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। বর্তমানে তিনি কলকাতায় মা নন্দিনী পালের সঙ্গে থাকেন। টলিউডে নিয়মিত কাজ না পাওয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আক্ষেপও প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সোহিনী নিজের জীবনের কিছু কঠিন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বাবার মৃত্যুর পর সংসারের অনেক দায়িত্ব তাঁকেই সামলাতে হয়েছে। বাড়ির বিভিন্ন কাজ, সরকারি-বেসরকারি নানা বিষয়, কাগজপত্রের কাজ থেকে শুরু করে ছোট-বড় সব সমস্যার সমাধানে তাঁকেই ছুটে বেড়াতে হয়। তাঁর কথায়, বাবা হঠাৎ করে চলে যাওয়ার পর অনেক কিছুই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, আর সেই সব গুছিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই এসে পড়ে। তবে তিনি এটাকে কোনও অভিযোগ বা নিজেকে ‘ভিক্টিম’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা নয় বলেও স্পষ্ট করেন।
সোহিনীর দাবি, তাঁর মতো অনেক মহিলাই একই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যান। বিশেষ করে যাঁদের বাবা নেই, বিয়ে হয়নি বা পরিবারে কোনও পুরুষ সদস্য নেই, তাঁদের অনেক সময় বাড়ির প্রধানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। কিন্তু তখন সমাজের একাংশের আচরণে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অভিনেত্রীর মতে, একজন মহিলা কোনও কাজের নির্দেশ দিলে অনেকেই তা সহজভাবে নিতে চান না। একই কাজ করানোর জন্য তাঁকে বহুবার বলতে হয়। অথচ একই কথা যদি কোনও পুরুষ বলেন, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে তা দ্রুত মেনে নেওয়া হয়। সোহিনী এটিকে সমাজের একটি “অপ্রিয় সত্য” বলে উল্লেখ করেছেন।
আরও পড়ুনঃ স্বরূপ বিশ্বাসের বিরু’দ্ধে মুখ খোলার জন্য হয়েছিলেন একঘরে! পেতেন না কাজ! মা’ফিয়া গ্রেফ’তার হতেই হাড়হিম করা অভিজ্ঞতা শোনালেন রূপালি ভট্টাচার্য
তাঁর বক্তব্য, একজন পুরুষের নির্দেশ যেখানে একবারেই কার্যকর হয়, সেখানে একজন মহিলাকে একই কথা বারবার বলতে হয়। এমনকি কাজ হয়ে গেলেও অনেক সময় বিরূপ মনোভাব বা অপ্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হয়। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, এই বিষয়টি তাঁকে ভাবায়, কারণ তিনি জানেন তাঁর মতো আরও বহু নারী প্রতিদিন একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। সমাজে নারী-পুরুষ সমতার কথা যতই বলা হোক, বাস্তব জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা এখনও সেই সমতার পথে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দেয় বলেই মনে করেন সোহিনী পাল।
