বাংলা বাণিজ্যিক ছবির ইতিহাসে অঞ্জন চৌধুরী এমন এক নাম, যাঁর কাজ আজও দর্শকদের মনে আলাদা জায়গা করে রয়েছে। পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক মূল্যবোধ এবং সাধারণ মানুষের জীবনের নানা গল্পকে সহজভাবে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন তিনি। তাঁর পরিচালিত একাধিক ছবি সেই সময়ে দর্শকদের বিপুল ভালোবাসা পেয়েছিল। এমনও ছবি রয়েছে, যা প্রেক্ষাগৃহে টানা ২০০ দিনেরও বেশি সময় চলেছিল। বাংলা সিনেমাকে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রয়াত হন এই পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার। তবে তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরেও তাঁকে ঘিরে পরিবারের আক্ষেপ রয়ে গিয়েছে।
সম্প্রতি বাবাকে নিয়ে সেই অভিমানের কথাই প্রকাশ্যে এনেছেন অঞ্জন চৌধুরীর কন্যা রীণা চৌধুরী। তাঁর অভিযোগ, মা-মাটি-মানুষের সরকারের আমলে দীর্ঘ ১৫ বছর কেটে গেলেও তাঁর বাবাকে প্রাপ্য সরকারি সম্মান দেওয়ার বিষয়ে তেমন কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি। শুধু কোনও পুরস্কার বা সরকারি স্বীকৃতির প্রশ্নই নয়, অঞ্জন চৌধুরীর জন্মদিন কিংবা মৃত্যুবার্ষিকীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনেও প্রশাসনের তরফে বিশেষভাবে তাঁকে স্মরণ করা হয়নি বলেই দাবি করেছেন রীণা। বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য বাবার এত বছরের অবদান থাকা সত্ত্বেও এই নীরবতা তাঁকে এখনও কষ্ট দেয়। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, বাবার কাজের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার আক্ষেপ পরিবারের মধ্যে এখনও রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে রীণা চৌধুরী নিজের পরিবারের অবস্থানের কথাও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, বাবাকে নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই ক্ষোভ নিয়ে তাঁদের বিশেষ কিছু করার নেই। তিনি বলেন, “ক্ষোভ তো রয়েছে, কিন্তু কিছু করার নেই। আমরা তো এখন গিয়ে গিয়ে বলতে পারব না যে বাবাকে পুরস্কার দিন বা সম্মান দিন।” তাঁর মতে, কোনও শিল্পীকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দেওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যদের বারবার গিয়ে আবেদন জানাতে হওয়া উচিত নয়। একজন মানুষের কাজ এবং অবদানই তাঁর পরিচয় তৈরি করে। তাই বাংলা চলচ্চিত্রকে যাঁরা নিজেদের কাজ দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের অবদান সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সমাজ ও প্রশাসনেরও দায়িত্ব বলে মনে করেন তিনি।
অঞ্জন চৌধুরীর পরিচালিত ছবিগুলির জনপ্রিয়তা বাংলা সিনেমার একটি বিশেষ সময়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। সাধারণ দর্শকের পারিবারিক সমস্যা, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সামাজিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে তিনি এমন গল্প তৈরি করতেন, যার সঙ্গে বহু মানুষ নিজেদের জীবনকে মিলিয়ে নিতে পারতেন। তাঁর ছবির জনপ্রিয়তা শুধু প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, দীর্ঘদিন ধরে বাংলা বাণিজ্যিক ছবির সাফল্যের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে ছিল। সেই কারণেই তাঁর কন্যার দাবি সামনে আসার পর আবারও প্রশ্ন উঠছে, বাংলা সিনেমার ইতিহাসে যাঁদের অবদান এতটা গুরুত্বপূর্ণ, তাঁদের স্মৃতি কি যথেষ্টভাবে ধরে রাখা হচ্ছে? সময়ের সঙ্গে তাঁদের কাজ যেন বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে না যায়, সেই বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আরও পড়ুনঃ ‘বিজেপি সবচেয়ে বড় অশুভ শক্তি’, মন্তব্য কৌশিক সেনের, পাল্টা কটা’ক্ষে অভিনেতাকে আয়না দেখালো নেটপাড়া
রীণা চৌধুরীর বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর বাংলা চলচ্চিত্রের শিল্পীদের প্রাপ্য সম্মান নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে অঞ্জন চৌধুরীর মতো নির্মাতার কাজ নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি করে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যে সময় তাঁর ছবিগুলি দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহমুখী করেছিল এবং বাংলা বাণিজ্যিক ছবিকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছিল, সেই অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছে কি না, সেটাই এখন আলোচনার বিষয়। পরিবারের তরফে উঠে আসা এই আক্ষেপ সেই পুরনো প্রশ্নকেই আবার সামনে এনে দিয়েছে। বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের অন্যতম পরিচিত নির্মাতাকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দেওয়ার বিষয়ে ভবিষ্যতে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
