জয়েন গ্রুপ

বাংলা সিরিয়াল

এই মুহূর্তে

“অসম্ভব রূপসী, অথচ অহংকার ছিল না… আমাদের সময়ে ক’জন অভিনেতা ও অভিনেত্রী তাদের যোগ্য সম্মান পেয়েছেন?” “মিঠু ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব সুন্দরী, গড়ন এবং ব্যক্তিত্ব খুব সহজেই নজর কাড়ত, কিন্তু…” মিঠু মুখার্জির প্রয়াণে পুরনো স্মৃতি ফিরে দেখলেন বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়, ভাগ করলেন অজানা অধ্যায়?

গত এক বছর ধরে মারণরোগ ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মিঠু মুখার্জি। শেষপর্যন্ত ৭১ বছর বয়সে এসে জীবনযুদ্ধে হার মানলেন তিনি। গত রবিবার রাতে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অভিনেত্রী। ‘মর্জিনা আবদাল্লা’, ‘মৌচাক’, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’র মতো ছবিতে অভিনয় করে একসময় বাংলা এবং হিন্দি দুই ছবির জগতেই নিজের পরিচিতি তৈরি করেছিলেন তিনি। তবে জীবনের শেষ দিকে ধীরে ধীরে অভিনয় জগতের আলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন মিঠু। তাঁর মৃত্যুর খবর সামনে আসতেই তাই ফিরে আসছে বাংলা সিনেমার এক পুরনো সময়ের নানা স্মৃতি। সেই স্মৃতিরই কিছু কথা শোনালেন অভিনেতা বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়, যিনি মিঠুকে অভিনেত্রী হওয়ার অনেক আগে থেকেই চিনতেন।

মিঠুর সঙ্গে তাঁর পরিচয় যে অভিনয় জগতে আসার পর থেকে নয়, তা জানালেন বিপ্লব। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, মিঠুর বাবা এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে তাঁর বহুদিনের পরিচয় ছিল। বিডন স্কোয়ারে যে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়, একসময় সেই পুজোর দায়িত্বে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন মিঠুর বাবা। এমনকি মিঠুর ব্যক্তিগত শিক্ষকের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ছিল বলে জানান অভিনেতা। অর্থাৎ মিঠু অভিনেত্রী হওয়ার আগেই তাঁর পরিবারের সঙ্গে বিপ্লবের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। বিপ্লবের কথায়, “মিঠুকে আমি তখন থেকেই চিনতাম, যখন ও অভিনয় শুরুই করেনি। ওর বাবার সঙ্গে আমার খুব ভালো পরিচয় ছিল। বিডন স্কোয়ারের পুজোর সঙ্গে উনি দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। মিঠু বড় পরিবারের মেয়ে ছিল, আর ওর ব্যক্তিগত শিক্ষকের সঙ্গেও আমার পরিচয় ছিল। তাই ওদের পরিবারের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল এবং বহু বছর সেই সম্পর্ক বজায় ছিল।” মিঠুর মৃত্যুর খবরও খুব অল্প সময় আগেই তাঁর কাছে পৌঁছেছিল বলে জানান বিপ্লব।

অভিনেত্রীর সৌন্দর্য নিয়েও পুরনো দিনের কথা স্মরণ করেন বিপ্লব। তাঁর থেকে বয়সে কিছুটা ছোট মিঠু অল্প বয়স থেকেই সকলের নজর কেড়ে নিতেন বলে জানান তিনি। শুধু সুন্দর চেহারাই নয়, নাচের দক্ষতা এবং ব্যক্তিত্বও তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। বিপ্লবের কথায়, “মিঠু ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব সুন্দরী ছিল। তার সঙ্গে ছিল নাচের দক্ষতা, সুন্দর গড়ন এবং এমন একটা ব্যক্তিত্ব, যা খুব সহজেই মানুষের নজর কাড়ত।” অভিনয়ে আসার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন মিঠু। পরপর দু’বছরে ‘মর্জিনা আবদাল্লা’ এবং ‘মৌচাক’ ছবিতে অভিনয় করে দর্শকের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান তিনি। এরপর রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে জুটি বেঁধে ‘স্বয়ংসিদ্ধা’র মতো ছবিতেও নজর কাড়েন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলা ছবির পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

তবে সৌন্দর্য এবং জনপ্রিয়তা কখনও মিঠুর ব্যবহারে অহংকার নিয়ে আসেনি বলেই মনে করেন বিপ্লব। তাঁর মতে, এখনকার অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী একটি দৃশ্যে অভিনয় করেই যে ধরনের দম্ভ দেখান, মিঠুর মধ্যে তার সামান্যতম প্রকাশও ছিল না। তবে তিনি খুব বেছে নেওয়া কিছু মানুষের সঙ্গেই বেশি সময় গল্প বা আড্ডা দিতেন বলে জানান বিপ্লব। অভিজাত পরিবারের মেয়ে হওয়ার কারণে ছোট থেকেই নিজের পারিবারিক পরিবেশ এবং আভিজাত্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন তিনি। কিছুটা ঘরকুনো স্বভাবের হলেও মিঠু কখনও অভদ্র ছিলেন না বলেই দাবি অভিনেতার। বিপ্লব বলেন, “আজকাল অনেকেই সামান্য কাজ করেই যে ধরনের অহংকার দেখান, মিঠুর মধ্যে তার কোনও চিহ্ন ছিল না। ও নিজের পছন্দের মানুষদের সঙ্গে গল্প করতে ভালোবাসত। বড় এবং অভিজাত পরিবারে বড় হওয়ার কারণে ছোট থেকেই নিজের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন ছিল। কিছুটা ঘরকুনো হলেও ও মোটেই অভদ্র ছিল না, বরং সামগ্রিকভাবে যথেষ্ট মিশুক স্বভাবেরই ছিল।” মিঠুর ব্যক্তিত্বের এই দিকটিই তাঁর স্মৃতিতে আলাদা করে থেকে গিয়েছে বলে জানান তিনি।

বাংলা ছবির পাশাপাশি হিন্দি ছবিতেও কাজ করেছিলেন মিঠু মুখার্জি। বিপ্লবের চোখে, পর্দায় তাঁর উপস্থিতিও ছিল যথেষ্ট আকর্ষণীয় এবং সহজেই দর্শকের নজর কাড়ত।
তবে একটা সময়ের পর অভিনেত্রীর জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসে। কলকাতায় থাকা তাঁর একাধিক ফ্ল্যাট এবং বাড়ি বিক্রি করে তিনি মুম্বইয়ে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে অভিনয় জগতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কমতে থাকে। নিজেকেও ইন্ডাস্ট্রির আলো থেকে অনেকটাই সরিয়ে নেন তিনি। বিপ্লবের কথায়, “মিঠু হিন্দি ছবিতেও ভালো কাজ করেছিল এবং পর্দায় ওর উপস্থিতি ছিল খুবই নজরকাড়া। কিন্তু পরে কলকাতার একাধিক ফ্ল্যাট এবং বাড়ি বিক্রি করে মুম্বইয়ে স্থায়ীভাবে চলে গেল। ধীরে ধীরে অভিনয় জগতের আলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল এবং আমাদের সবার সঙ্গেও যোগাযোগ কমিয়ে দিল।”

মিঠুর মৃত্যুর প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শেষপর্যন্ত তাঁর প্রাপ্য সম্মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। যে মাপের অভিনেত্রী ছিলেন তিনি, সেই অনুযায়ী কি জীবদ্দশায় যথেষ্ট সম্মান পেয়েছিলেন মিঠু? এই প্রশ্নের উত্তরে কিছুটা ক্ষোভের সুরই শোনা যায় বিপ্লবের গলায়। তিনি বলেন, “শুধু মিঠু কেন, আমাদের সময়ের কতজন অভিনেতা-অভিনেত্রীই বা তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মান পেয়েছেন, সেটাই আগে ভাবা দরকার।” মিঠু মুখার্জির প্রয়াণের সঙ্গে বাংলা সিনেমার একটি পরিচিত অধ্যায়েরও অবসান হল। তবে তাঁর অভিনীত ছবিগুলি, পর্দায় তৈরি করা আলাদা উপস্থিতি এবং কাছের মানুষদের মনে জমে থাকা স্মৃতিগুলি থেকে যাবে। বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণে তাই আবারও সামনে এল সেই সময়ের মিঠু, যিনি অল্প কয়েকটি ছবিতেই নিজের সৌন্দর্য, অভিনয় এবং ব্যক্তিত্ব দিয়ে দর্শকের মনে আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন।

Piya Chanda

                 

You cannot copy content of this page