‘এখনকার বিজয়া শুধুই শুকনো আদিখ্যেতা, আন্তরিকতা নেই!’ ৯৪ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে কেন এমন আক্ষেপ বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মিতা চট্টোপাধ্যায়ের?

বাঙালির দুর্গাপুজো মানেই আনন্দ, উৎসব আর প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো। আর পুজো শেষের বিজয়া দশমী মানেই আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাতায়াত, গুরুজনদের প্রণাম, আশীর্বাদ আর মিষ্টিমুখ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়েছে সেই চেনা ছবিটাই। এখন আর আগের মতো বাড়িতে বাড়িতে বিজয়া করতে যাওয়ার রীতি তেমন চোখে পড়ে না। ফোন কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের কয়েকটি বার্তাতেই সেরে ফেলা হয় শুভেচ্ছা বিনিময়। আর এই পরিবর্তনই মন খারাপ করিয়েছে বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মিতা চট্টোপাধ্যায়ের। ৯৪ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে পুরনো দিনের বিজয়ার স্মৃতি হাতড়ে বর্তমান সময়ের সঙ্গে তুলনা টানলেন তিনি।

ছোটবেলার বিজয়ার কথা মনে পড়লে আজও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অভিনেত্রী। তাঁর ছোটবেলা কেটেছে ভবানীপুরে। বাবার হাত ধরে ঠাকুর দেখতে যাওয়া, সন্ধিপুজো দেখতে দেখতে বাবার কোলেই ঘুমিয়ে পড়া, তারপর ঘুম ভাঙলে পুজোবাড়ি থেকে ফুলকো লুচি আর পায়েস পাওয়া—সবই আজও তাঁর স্মৃতিতে উজ্জ্বল। পুজো মিটে গেলেও আনন্দের রেশ কাটত না। বিজয়ার দিন বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড় লেগে থাকত। মা তৈরি করতেন নারকেলের নানা রকম মিষ্টি। আর বিকেল হলেই বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ার প্রতিবেশীদের বাড়িতে প্রণাম করতে বেরিয়ে পড়তেন মিতা।

সেই সময়ের বিজয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি মজার স্মৃতিও। বাবার বড় রুমালের চারটি কোণ বেঁধে থলির মতো বানিয়ে নিতেন অভিনেত্রী। প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে পাওয়া নাড়ু-মিষ্টি জমিয়ে রাখতেন সেই রুমালে। কোথাও মিলত কালোজিরে দেওয়া ছোট ছোট নিমকি, কোথাও আবার হালুয়া। কোনও বাড়িতে গুরুজনেরা ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করতেন। প্রতিটি বাড়ির নিজস্ব আয়োজন আর আন্তরিকতাই বিজয়াকে করে তুলত আরও আনন্দময়। সেই দিনগুলির কথা বলতে গিয়েই অভিনেত্রীর মনে হয়েছে, এখনকার প্রজন্ম হয়তো এমন অভিজ্ঞতার স্বাদই পায় না।

বর্তমান সময়ের বিজয়া উদ্‌যাপন নিয়ে নিজের আক্ষেপের কথা জানিয়েছেন মিতা। তাঁর মতে, এখন ফোনে কয়েকটি কথা বলেই অনেক সময় শুভেচ্ছা বিনিময় শেষ হয়ে যায়। ‘শুভ বিজয়া’, ‘ভাল আছো তো’, ‘প্রণাম নিও’—এই কয়েকটি কথাতেই যেন দায়িত্ব পালন করা হয়। তাই বর্তমানের বিজয়াকে তাঁর ‘শুকনো আদিখ্যেতা’ বলে মনে হয়। তবে প্রযুক্তির বিরোধী নন অভিনেত্রী। ৯৪ বছর বয়সেও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সময়ের সঙ্গে বদল আসবেই, কিন্তু সামনাসামনি কথা বলার আন্তরিকতা আর ফোনে বা লিখে শুভেচ্ছা জানানোর মধ্যে পার্থক্য থেকেই যায়।

তবে অতীতের স্মৃতিতে ডুবে থাকলেও বর্তমানকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন না মিতা চট্টোপাধ্যায়। জীবনের এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে বছরে একবার কেউ ফোন করলেও সেটুকুকেই মূল্য দিতে চান তিনি। তাঁর কাছে বিজয়া শুধু উৎসবের শুভেচ্ছা নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কেরও প্রতীক। ছোটবেলার সেই আনন্দ, আত্মীয়দের ভিড়, প্রতিবেশীদের আশীর্বাদ আর বাবার রুমালে জমিয়ে রাখা মিষ্টির স্মৃতি আজও তাঁকে নস্টালজিক করে তোলে। সময় বদলেছে, বদলেছে উৎসবের ধরনও। কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের আন্তরিক যোগাযোগ যে কতটা মূল্যবান, মিতার কথায় যেন সেই বার্তাই উঠে এলো।

Rimi Datta

রিমি দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। কপি রাইটার হিসেবে সাংবাদিকতা পেশায় চার বছরের অভিজ্ঞতা।

                 

You cannot copy content of this page