সন্তান হারানোর যন্ত্রণা, সমাজের কটাক্ষ, তারপরই মা কালীর বেশে নতুন ভিডিও! মাতৃত্বের মতো সংবেদনশীল বিষয়কেও কি কনটেন্ট বানিয়ে ফেললেন সোহিনী? ইনফ্লুয়েন্সারের পোস্টে ক্ষুব্ধ নেটপাড়া!

সমাজমাধ্যমে পরিচিত মুখ ইনফ্লুয়েন্সার সোহিনী গঙ্গোপাধ্যায়। গত বছর মাতৃত্বের স্বপ্ন পূরণের আগেই এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল তাঁকে। সন্তানকে মৃত অবস্থায় জন্ম দিতে হয়েছিল সোহিনীকে। সেই কঠিন সময়ের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা নিয়েই সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন তিনি। ভিডিওর প্রথম অংশে উঠে এসেছে সন্তান হারানোর পর তাঁর জীবনে নেমে আসা অন্ধকার সময়ের কথা। শুধু সন্তান হারানোর শোকই নয়, সেই সময় সমাজের একাংশের কাছ থেকেও নানা কটূক্তি শুনতে হয়েছিল তাঁকে। এমনকী তাঁকে অপয়া বলেও মন্তব্য করা হয়েছিল বলে ভিডিওতে তুলে ধরেছেন সোহিনী। তবে ভিডিওর পরবর্তী অংশে সম্পূর্ণ অন্য রূপে ধরা দিয়েছেন তিনি। এবার মা কালীর সাজে দেখা গিয়েছে তাঁকে। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সৃষ্টির পালনের বার্তা তুলে ধরতেই এমন রূপ নিয়েছেন ইনফ্লুয়েন্সার।

ভিডিওর মাধ্যমে সোহিনী যেন বোঝাতে চেয়েছেন, মা কালী যেমন দুষ্টের দমন করেন এবং সৃষ্টিকে রক্ষা করেন, তেমনই জীবনের সমস্ত অন্যায় ও কষ্টের বিচারও তাঁর কাছেই রয়েছে। নিজের ব্যক্তিগত যন্ত্রণার সঙ্গে দেবী কালীর শক্তিকে মিলিয়ে একটি বিশেষ বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। ভিডিওটির সঙ্গে একটি আবেগঘন ক্যাপশনও লিখেছেন সোহিনী। সেখানে নিজের মৃত সন্তানকে ঘিরে মনের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, জন্মের পর মৃত অবস্থায় পৃথিবীতে আসা তাঁর ছেলের নাম রেখেছেন দেবদৈবান। সোহিনীর কথায়, মা কালীর কোলে দৈবান ভালোই আছে। একইসঙ্গে তিনি লিখেছেন, মা কালী সব দেখছেন। তাঁর মা কী ভাবে কষ্ট পেয়েছেন এবং এখনও সেই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন, সেটাও দেবী জানেন। সন্তানকে হারানোর পরেও নিজের বিশ্বাস এবং ভক্তির জায়গা থেকে শক্তি খুঁজে নেওয়ার কথাই যেন এই পোস্টের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন তিনি।

তবে সোহিনীর এই ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে সমালোচনা। অনেকেরই প্রশ্ন, জীবনের এতটা সংবেদনশীল এবং ব্যক্তিগত একটি ঘটনাকেও কী ভাবে কনটেন্টের বিষয় করে তোলা যায়? সন্তান হারানোর মতো মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা যে কোনও মায়ের কাছেই অত্যন্ত যন্ত্রণার। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলা অবশ্যই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেটিকে ভিডিওর মাধ্যমে বিনোদনমূলক কনটেন্টের আকারে পরিবেশন করার প্রয়োজনীয়তা কোথায়, সেই প্রশ্ন তুলছেন নেটিজেনদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, সমাজমাধ্যমে নিজেদের জীবনের নানা ঘটনা ভাগ করে নেওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি ব্যক্তিগত অনুভূতিকেই কনটেন্টে পরিণত করতে হবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। বিশেষ করে মাতৃত্বের মতো আবেগঘন বিষয়কে কেন্দ্র করে কনটেন্ট তৈরি করার ক্ষেত্রে আরও সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন বলেই মনে করছেন অনেকে।

এক নেটিজেনের বক্তব্য, যাঁরা জন্মসূত্রে তারকা বা পরিচিত মুখ, তাঁরা সাধারণত নিজেদের জীবনের প্রতিটি ব্যক্তিগত মুহূর্ত এ ভাবে কনটেন্টের মাধ্যমে তুলে ধরেন না। বিশেষ করে মাতৃত্বের মতো বিষয়কে সামনে রেখে এমন প্রচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, সোহিনী যখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন, তখনও এই বিষয় নিয়ে সমাজমাধ্যমে নানা কনটেন্ট তৈরি করেছেন। আর এবার এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও সেটিকে ভিডিওর বিষয় করে তোলা হচ্ছে। ওই নেটিজেন আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন বহু মহিলাকে সন্তান হারানোর মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। সেই শোক কাটিয়ে জীবনে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন ঠিকই, কিন্তু তার জন্য প্রতিটি অনুভূতিকে এ ভাবে প্রকাশ্যে কনটেন্টে পরিণত করা জরুরি নয়। বরং এই ধরনের ভিডিও অন্য অন্তঃসত্ত্বা মহিলা কিংবা নতুন করে মাতৃত্বের স্বপ্ন দেখা নারীদের মনে ভয় ও মানসিক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

সমালোচকদের আরও বক্তব্য, নিজেকে ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে পরিচয় দিলে তার সঙ্গে কিছু সামাজিক দায়িত্বও এসে যায়। একজন ইনফ্লুয়েন্সারের কথা ও কাজ বহু মানুষের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কোন বিষয় কী ভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, সোহিনীর এই ভিডিও ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার বদলে উল্টে নেতিবাচক আলোচনা তৈরি করছে। যদিও সন্তান হারানোর পর নিজের কষ্ট প্রকাশ করা কিংবা মা কালীর প্রতি বিশ্বাসের কথা জানানো সম্পূর্ণই সোহিনীর ব্যক্তিগত বিষয়, তবু সেই প্রকাশের ধরন নিয়েই আপত্তি নেটিজেনদের একাংশের। তাঁদের বক্তব্য, নিজের জীবনে ভালো থাকুন, অন্যদেরও ভালো থাকতে দিন। সমাজমাধ্যমে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্বও ইনফ্লুয়েন্সারদের মনে রাখা উচিত। তবে সমালোচনার মুখে সোহিনী এই ভিডিও নিয়ে নতুন করে কোনও প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন কি না, তা এখনও জানা যায়নি।

Piya Chanda

                 

You cannot copy content of this page