দুর্গাপুজো মানেই মায়ের আরাধনা, ভক্তি আর আবেগের মেলবন্ধন। সেই আবহেই মা দুর্গাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি হয়েছে বিশেষ আগমনী নিবেদন ‘তুমি মা’। Caring Minds International-এর প্রযোজনায় এই পরিবেশনায় অংশ নিয়েছেন বিক্রম ঘোষ অ্যাকাডেমি অফ পারফর্মিং আর্টসের (BGAPA) প্রতিভাবান ছাত্রছাত্রীরা। মা দুর্গা ও তাঁর সন্তানদের চিরন্তন সম্পর্কের আবেগকে সঙ্গীত, নৃত্য ও তালবাদ্যের মাধ্যমে তুলে ধরাই এই পরিবেশনার মূল ভাবনা। বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী বিক্রম ঘোষ এই গানের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। গানের কথা লিখেছেন সুগত গুহ এবং কণ্ঠ দিয়েছেন নির্মাল্য রায়। কিবোর্ড প্রোগ্রামিংয়ের দায়িত্বে রয়েছেন কুণাল দাস। অন্যদিকে, গানটির মিক্সিং ও মাস্টারিং করেছেন সুমন দে। সব মিলিয়ে ভক্তি ও শিল্পের মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছে এই বিশেষ নিবেদন।
‘তুমি মা’ গানটির শুরু হয়েছে ভৈরব রাগের আলাপ দিয়ে। সুরের সেই আবহে ফুটে উঠেছে দেবী দুর্গার আগমনকে ঘিরে ভক্তের আকুলতা। গানের প্রথম পংক্তি ‘অসুরদলনী পালনকারিণী মা তুমি মা’ থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে দেবীর শক্তি ও মাতৃরূপের বন্দনা। এখানে মা দুর্গাকে শুধু অসুরদলনী হিসেবেই দেখানো হয়নি, বরং জীবজগতের সকল সন্তানের আশ্রয় হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। জীবনের নানা লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি যে মায়ের কাছ থেকেই আসে, সেই ভাবনাই গানের কথায় ফুটে উঠেছে। সুরের সঙ্গে তবলার তাল মিলে এই অনুভূতিকে আরও গভীর করে তুলেছে। গানের বিভিন্ন অংশে তালের পরিবর্তনও বিশেষভাবে নজর কাড়ে। ফলে চেনা আগমনী গানের ধারার মধ্যেও ‘তুমি মা’ নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।
এই গানের অন্যতম আকর্ষণ বিক্রম ঘোষের তবলাবাদন। তাঁর তালবাদ্যে দেবীর আগমন, অশুভ শক্তির বিনাশ এবং ভক্তদের অভয় দেওয়ার ভাবনা ফুটে উঠেছে। গানের শুরুতে যে শান্ত ও ভক্তিময় আবহ তৈরি হয়, সময়ের সঙ্গে তা বদলে যায় শক্তির প্রকাশে। শেষের দিকে তবলাবাদনের গতি ও তীব্রতা গানের আবেগকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেয়। অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তির কথাও যেন উঠে আসে এই পরিবেশনায়। গানের কথায় রয়েছে ঐক্যের বার্তা, যেখানে বলা হয়েছে, ‘আমরা তোমারই, তুমি মা সবার’। দেবী দুর্গাকে সকলের শক্তির উৎস হিসেবে তুলে ধরার এই ভাবনা গানটিকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে। শান্তি, ভক্তি ও শক্তির এমন মেলবন্ধনই ‘তুমি মা’ গানটির অন্যতম বিশেষত্ব।
গানটির শেষাংশে জয়া শীল ঘোষের উপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। লাল-সাদা আটপৌরে শাড়ি, খোলা চুল এবং কপালে লাল টিপে তাঁকে বাঙালি মায়ের চিরন্তন রূপে দেখা গিয়েছে। তাঁর উপস্থিতিতে দেবী দুর্গার মাতৃরূপ যেন আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। জয়া শীল ঘোষের প্রশিক্ষণে একদল শিল্পী ভারতনাট্যম পরিবেশন করেছেন। অন্যদিকে, সামিলা ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে শিল্পীরা কথক নৃত্যে অংশ নিয়েছেন। ভারতনাট্যম ও কথকের যুগলবন্দি গানটির দৃশ্যায়নে যোগ করেছে আলাদা মাত্রা। পোশাক পরিকল্পনায় লাল ও হলুদের ব্যবহারও উৎসবের আবহকে আরও উজ্জ্বল করেছে। সঙ্গীত, নৃত্য এবং পোশাকের এই সমন্বয়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় শিল্পের ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
৩ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের এই পরিবেশনায় বিক্রম ঘোষ অ্যাকাডেমির একাধিক ছাত্রছাত্রী অংশ নিয়েছেন। অ্যাডভান্সড স্টাডিজ ইন তবলা বিভাগের শিক্ষক ধীমান ভট্টাচার্য ও সুদীপ চক্রবর্তীর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন আরও অনেক শিল্পী ও শিক্ষার্থী। ড্রাম পরিবেশনার দায়িত্বে ছিলেন রনি দাসের তত্ত্বাবধানে থাকা উপমন্যু রায়, শ্রেয়াংশ মণ্ডল, চন্দ্রেশ বসু ও স্পন্দন দাস। ভিডিওটির পরিচালনা ও সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন অভিষেক দে। আর্ট ডিরেকশনে রয়েছেন প্রসেনজিৎ, আলোকসজ্জার দায়িত্বে রাজু এবং সম্পাদনা করেছে প্যারাডক্স এন্টারটেনমেন্ট। এই পরিবেশনার মধ্য দিয়ে দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি মানুষের অন্তরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলার বার্তাও দেওয়া হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি ও হতাশার মধ্যে ‘তুমি মা’ যেন মনে করিয়ে দেয়, ভক্তি ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়েও নতুন করে শক্তি খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
