দুর্গাপুজো অরিজিতা মুখোপাধ্যায়ের কাছে শুধু উৎসব নয়, ছোটবেলার স্মৃতি থেকে জীবনের নানা অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বিশেষ সময়। অভিনেত্রীর শৈশবের পুজোর কথা উঠলেই প্রথমে মনে পড়ে শিউলির গন্ধ। শান্তিনিকেতনে থাকার সময় উঠোনে ঝরে থাকা শিউলি কুড়িয়ে ভোর শুরু হত তাঁর। অজয়ের ধারে ফুটে থাকা কাশফুল এবং ছাতিমের গন্ধও তাঁর পুজোর স্মৃতির সঙ্গে মিশে রয়েছে। ছোটবেলায় পুজো মানেই ছিল নতুন জামা পাওয়ার আনন্দ। বাবার পৈতৃক ভিটে বর্ধমানের ভবানন্দপুর গ্রামের মুখোপাধ্যায় বাড়ির প্রায় ২৫০ বছরের পুরনো দুর্গাপুজোর সঙ্গেও তাঁর বিশেষ স্মৃতি রয়েছে। ক্লাস ফোরে পড়ার সময় তাঁদের পরিবারে পুজোর দায়িত্ব এসেছিল, তখন গ্রামে একটিই পুজো হওয়ায় উৎসব ঘিরে মানুষের ভিড়ও ছিল চোখে পড়ার মতো।
তখন অবশ্য পুজোর সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার সম্পর্কটা বুঝতেন না অরিজিতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মা দুর্গার সঙ্গে তাঁর নিজের একটি আধ্যাত্মিক যোগ তৈরি হয়েছে। পড়াশোনার সূত্রে কলকাতায় আসার পর পুজোর সময় শহরের আলো দেখতে ইচ্ছে করলেও বাবা-মায়ের জন্য তাঁকে বাড়ি ফিরে যেতে হত। পরে বন্ধুরা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়লেও কলকাতাকে আর ছাড়েননি তিনি। এখন তাঁর কাছে পুজো অনেকটাই বন্ধুদের পুনর্মিলনের সময়। এখনও পুজোর একটি দিন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার জন্য আলাদা করে রাখেন অভিনেত্রী। প্যান্ডেল ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে একেক দিন একেক জায়গায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা এবং খাওয়াদাওয়াই তাঁর বেশি পছন্দ। অভিনেত্রী হয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরও নিজের সাধারণ জীবনযাপন বদলাননি অরিজিতা, এমনকী যাতায়াতের জন্য এখনও রিকশায় ওঠেন এবং পথে মানুষ তাঁকে চিনতে পারলে সেটাও তাঁর ভাল লাগে।
‘নিম ফুলের মধু’ ধারাবাহিকের বাবুর মা চরিত্রটি অরিজিতাকে ঘরে ঘরে পরিচিতি দিয়েছে। তবে একটি চরিত্রের পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখতে চান না অভিনেত্রী। থিয়েটার, পাঠের অনুষ্ঠান এবং ধারাবাহিক, সব ক্ষেত্রেই আরও ভাল কাজ করার চেষ্টা করে চলেছেন তিনি। অভিনয়ে আসার কোনও পরিকল্পনাই তাঁর ছিল না। থিয়েটার করার পাশাপাশি পিএইচডি করছিলেন এবং কলেজে পড়ানোর ইচ্ছাও ছিল। কিন্তু থিয়েটার করে সংসার চালানো কঠিন হওয়ায় অন্য চাকরির কথাও ভাবছিলেন। সেই সময়ই আচমকাই অভিনয়ের সুযোগ আসে। অভিনয়ে এসে অবশ্য কঠিন অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। বডিশেমিংয়ের শিকার হয়ে একসময় এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে টানা ১৯ দিন আয়নার সামনে দাঁড়াননি। পরে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছেন এবং এখনও শুটিং ফ্লোরে নতুন কাউকে বডিশেমিং করা হলে তার বিরোধিতা করেন।
পুজোর আরও একটি আনন্দ অরিজিতার কাছে প্যান্ডেলে দাঁড়িয়ে সবার সঙ্গে অঞ্জলি দেওয়া এবং ভোগ খাওয়া। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুজোর আনন্দের পাশাপাশি প্রিয় মানুষদের হারানোর শূন্যতাও আরও স্পষ্ট হয়েছে তাঁর কাছে। বাবাকে হারানোর পর পুজোর দিনগুলিতে সেই অভাব আরও বেশি করে অনুভব করেন অভিনেত্রী। আগে যে বাবা পুজোয় এসে বলতেন, ‘ভাল লাগছে’, এখন আর সেই কথাটা শোনা যায় না। অরিজিতার কথায়, বয়স যত বাড়ছে, ভালবাসার মানুষও তত কমে আসছেন, আর সেই জায়গাটাই তাঁকে ফাঁকা লাগে। নিজের জন্য দুর্গার কাছে কী চাইবেন, সেই প্রশ্নের উত্তরে অবশ্য নিজের চাওয়া আলাদা করে প্রকাশ করেননি তিনি। বরং বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর প্রার্থনা ছড়িয়ে পড়েছে অনেক দূর পর্যন্ত।
দেবীর কাছে অরিজিতার সবচেয়ে বড় চাওয়া পৃথিবীতে শান্তি ফিরে আসা। তাঁর কথায়, আমরা খুব কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে যুদ্ধ এবং ধর্মকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে সংঘাত তৈরি হচ্ছে। তাঁর বিশ্বাস, হিন্দু ধর্ম তাঁকে শিখিয়েছে আদ্যাশক্তি মহামায়া জীব এবং জড়, সবকিছুর মধ্যেই বিরাজ করেন। তাই ধর্মের নামে বিভাজন নয়, মানুষের মধ্যেও বিভাজন নয়, এমন সমাজই চান তিনি। ক্ষমতার লড়াই বন্ধ হোক, মানবিকতা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠুক, মানুষের বিবেক জাগুক এবং মনের অন্ধকার দূর হোক, এটাই তাঁর প্রার্থনা। শুধু নিজের দেশ নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই এই শান্তি চান অভিনেত্রী। ইজরায়েল ও গাজার যুদ্ধে নিরপরাধ শিশুদের মৃত্যুর প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। একইসঙ্গে ভারতবর্ষের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য যেন অটুট থাকে, সেই কামনাও করেন অরিজিতা।
