জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত গায়িকা ইমন চক্রবর্তী এবং তাঁর দলের সদস্যরা আমেরিকায় অনুষ্ঠান করতে গিয়ে ডালাস বিমানবন্দরে সমস্যায় পড়েছেন। নিউ জার্সিতে দুর্গাপুজোর অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার উদ্দেশ্যে সেখানে যাচ্ছিলেন তাঁরা। ইমনের অভিযোগ, বৈধ বোর্ডিং পাস থাকা সত্ত্বেও আমেরিকান এয়ারলাইন্সের কর্মীরা তাঁদের বিমানে উঠতে বাধা দেন। প্রতিবাদ করতে গেলে বিমানবন্দরের কর্মীরা তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং ধাক্কা দিয়ে বোর্ডিং গেট থেকে সরিয়ে দেন বলেও অভিযোগ করেছেন ইমন। তাঁদের সঙ্গে থাকা পেশাদার বাদ্যযন্ত্র নিয়েও তৈরি হয় সমস্যা। এমনকি যাত্রাপথে বাদ্যযন্ত্র ভেঙে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় বিমান সংস্থা নেবে না বলে জানানো হয়েছিল বলে দাবি গায়িকার। শেষ পর্যন্ত এই পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত বিমানটি মিস করেন ইমন ও তাঁর দল, পরে বিকল্প বিমানে ওঠা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
ইমনের এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরেই অবশ্য নেটমাধ্যমে শুরু হয়েছে অন্য ধরনের আলোচনা।
একাংশের প্রশ্ন, আমেরিকায় কোনও অনুষ্ঠানে গিয়ে গান গাওয়া বা পারফর্ম করা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সফর নয়, সেটি কাজের সঙ্গেই যুক্ত। মার্কিন সরকারের নিয়ম অনুযায়ী পেশাদার শিল্পীদের paid performance-এর জন্য সাধারণ visitor visa যথেষ্ট নয়। শিল্পী বা entertainer-দের জন্য নির্দিষ্ট P শ্রেণির temporary worker visa রয়েছে, যার মধ্যে P-2 এবং P-3-এর মতো বিভাগও রয়েছে। কাজেই বিদেশে অনুষ্ঠান করতে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ভিসা ও প্রয়োজনীয় অনুমতিগুলি ঠিকঠাক রয়েছে কি না, তা জানা এবং মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনও ভারতীয় শিল্পীই এমন ভিসা রাখেন না বা শিল্পীরা নিয়ম না মেনেই আমেরিকায় যান, এমন সাধারণীকরণের পক্ষে কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে নেই। বরং মার্কিন প্রশাসনের তথ্যেই স্পষ্ট, পেশাদার পারফরম্যান্সের জন্য পরিস্থিতি অনুযায়ী আলাদা ভিসা ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে। এখানেই ইমনকে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছেন নেটিজেনদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, বিদেশে অনুষ্ঠান করার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম, ভিসা এবং বিমানে যন্ত্রপাতি বহনের শর্তগুলি শিল্পী ও তাঁদের দলের জানা উচিত। কেউ কেউ এমনও দাবি করেছেন, অনুষ্ঠান করে পাওয়া পারিশ্রমিক কীভাবে দেশে আনা হবে, সেটিও আগে থেকে বৈধভাবে ঠিক করা প্রয়োজন। তবে কোনও শিল্পী বেআইনিভাবে অনুষ্ঠান করতে যান বা অনুষ্ঠান শেষে বেআইনি পথে টাকা ভারতে আনেন, এমন অভিযোগ ইমনের ক্ষেত্রে প্রমাণিত নয়।
এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ভারতীয় আইন এবং মার্কিন আইনকে এক করে দেখার বিরুদ্ধেও মন্তব্য করেছেন অনেকে। তাঁদের যুক্তি, নিজের দেশে কোনও নিয়ম যেভাবে কাজ করে, অন্য দেশে গিয়ে একই সুবিধা পাওয়া যাবে এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। বিশেষ করে আমেরিকায় বিমানযাত্রা এবং পেশাদার সরঞ্জাম বহনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে, তাই যাত্রার আগেই সেই শর্তগুলি দেখে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ওঠা প্রশ্নটিও এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নেটিজেনদের একাংশের বক্তব্য, কোনও শিল্পীর অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় বাদ্যযন্ত্র যদি সাধারণ যাত্রীর লাগেজের তুলনায় বেশি বা বড় হয়, তাহলে বিমানেই সবকিছু নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে এমনটা নয়। তবে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের প্রকাশিত নিয়ম অনুযায়ী ছোট বাদ্যযন্ত্র নির্দিষ্ট শর্তে carry-on হিসেবে নেওয়া যায়। আবার প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত আসন কিনে বাদ্যযন্ত্র নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। চেকড ইন্সট্রুমেন্টের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট আকার ও ওজনের সীমা রয়েছে, আর তার বেশি হলে কার্গোর মাধ্যমে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ শিল্পীদের যন্ত্রপাতি বহনের জন্য বিমানের পাশাপাশি cargo বা freight-এর মতো বিকল্প ব্যবস্থাও রয়েছে। এই কারণেই নেটিজেনদের একাংশের প্রশ্ন, এত বেশি সরঞ্জাম নেওয়া যদি অনুষ্ঠানের জন্য জরুরি হয়, তাহলে আগে থেকেই উপযুক্ত পরিবহণের ব্যবস্থা করা হয়নি কেন।
সব মিলিয়ে ইমন চক্রবর্তীর ডালাস বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা ঘিরে এখন দু ধরনের আলোচনা চলছে। একদিকে রয়েছে বিমান সংস্থার কর্মীদের বিরুদ্ধে ইমনের তোলা দুর্ব্যবহার ও ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগ, যার পূর্ণ ব্যাখ্যা এখনও বিমান সংস্থার পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে নেটিজেনদের একাংশ বলছেন, বিদেশে কাজ করতে গেলে সেই দেশের নিয়মকানুনও সমান গুরুত্ব দিয়ে মেনে চলতে হয়। কেউ কেউ মনে করছেন, ভারতীয় তারকা হলেই আমেরিকার বিমানবন্দরে আলাদা সুবিধা পাওয়া যাবে, এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। আবার এই মন্তব্যের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন উঠতে পারে, কারণ বিমানবন্দরে কর্মীদের আচরণ এবং যাত্রীর নিয়ম মেনে চলা, দুটো বিষয়ই আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। ইমনের ক্ষেত্রে আসলে ভিসা, বোর্ডিং এবং বাদ্যযন্ত্র বহনের ঠিক কোন নিয়ম নিয়ে সমস্যা হয়েছিল, তার বিস্তারিত তথ্য সামনে এলে ছবিটা আরও পরিষ্কার হবে। তবে আপাতত ইমনের অভিযোগ এবং নেটিজেনদের পালটা প্রশ্ন ঘিরেই আমেরিকায় তাঁর অনুষ্ঠানযাত্রার ঘটনা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
