অসমের সংগীতজগতের অন্যতম জনপ্রিয় নাম জুবিন গর্গ। গায়ক, সুরকার, গীতিকার, অভিনেতা এবং পরিচালক হিসেবে তিনি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। শুধু শিল্পী হিসেবেই নয়, একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল সমান উজ্জ্বল। অহমিয়া, বাংলা, হিন্দিসহ একাধিক ভাষায় অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন তিনি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠদের মতে, মঞ্চের আলো থেকে দূরে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর স্বভাব। মানুষের প্রয়োজনে নিঃশব্দে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বহু গল্প আজও অসমের মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
এক সাক্ষাৎকারে পরিচালক প্রীতম বন্দ্যোপাধ্যায় জুবিন গর্গকে নিয়ে এমনই কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমার নিজের চোখে দেখা। সদ্য হয়তো পারিশ্রমিক পেয়েছেন। কিন্তু রাতে গাড়ি নিয়ে বেরোনোর পরে সবটাই দিয়ে দিতেন পথের দরিদ্র মানুষকে। এমনও হয়েছে, মানুষ হয়তো ঘুমোচ্ছেন। তাঁদের চাদরের তলায় টাকা রেখে আসতেন।” প্রীতমের এই বক্তব্য আবারও সামনে নিয়ে এসেছে জুবিনের সেই মানবিক মুখ, যা তাঁর অনুরাগীদের কাছে বরাবরই অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে রয়েছে।
শুধু ফুটপাথবাসী নন, আর্থিক সমস্যায় পড়া ছাত্রছাত্রী, অসুস্থ মানুষ কিংবা অসহায় পরিবারের খোঁজও রাখতেন জুবিন গর্গ। প্রীতম বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, কার পড়াশোনা টাকার অভাবে আটকে রয়েছে, কার চিকিৎসার জন্য সাহায্য দরকার কিংবা কার মেয়ের বিয়ে দিতে সমস্যা হচ্ছে, এমন খবরও তাঁর কাছে পৌঁছে যেত। সুযোগ পেলেই তিনি সাহায্য করতেন। বহু ক্ষেত্রেই সেই সাহায্যের কথা প্রকাশ্যে আসেনি। কারণ প্রচারের আলোয় নয়, মানুষের মুখে হাসি ফোটাতেই তিনি বেশি বিশ্বাস করতেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন।
জুবিন গর্গের মৃত্যুর পর অসমজুড়ে যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছিল, তা দেশের বহু মানুষকে আবেগপ্রবণ করেছিল। এক সাক্ষাৎকারে প্রীতম বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, জুবিনের মৃত্যুর পর বহু মানুষ স্বেচ্ছায় প্রায় এক মাস আমিষ খাবার থেকে বিরত ছিলেন এবং বহু জায়গায় মাংসের দোকানও খোলেনি। তাঁর কথায়, এই সিদ্ধান্ত কেউ চাপিয়ে দেননি, বরং শিল্পীর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থেকেই সাধারণ মানুষ এমনটা করেছিলেন। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, একজন গায়ক হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবেও জুবিন গর্গ কতটা গভীরভাবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।
এই সব স্মৃতিই আবার সামনে এসেছে জুবিন গর্গকে নিয়ে তৈরি হওয়া একটি নতুন ছবির প্রসঙ্গে। এক সাক্ষাৎকারে পরিচালক প্রীতম বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, জুবিনের সঙ্গে কাটানো সময়, তাঁর উদারতা, সাধারণ মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং অজানা মানবিক দিকগুলিকেই তিনি ছবির মাধ্যমে তুলে ধরতে চান। তাঁর মতে, একজন শিল্পীর আসল পরিচয় শুধু তাঁর সৃষ্টিতে নয়, মানুষের প্রতি তাঁর আচরণেও লুকিয়ে থাকে। আর সেই কারণেই জুবিন গর্গের স্মৃতি আজও অসমের মানুষের কাছে সমানভাবে জীবন্ত।
