থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের জীবন বরাবরই সহজ ছিল না। মঞ্চে অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও শুধুমাত্র নাটক করে সংসার চালানো যে কঠিন, সেই বাস্তব অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরেছেন অভিনেতা শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়। তাঁর নিজের থিয়েটার করার সময়ও অভিনয় থেকে নিয়মিত উপার্জনের সুযোগ ছিল না। তার আগের প্রজন্মের বহু নাট্যকর্মীকেও তাই অভিনয়ের পাশাপাশি অন্য পেশার উপর নির্ভর করতে হয়েছে। কেউ সরকারি চাকরি করেছেন, কেউ বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেছেন, আবার কেউ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, শম্ভু মিত্র এবং উৎপল দত্তের মতো বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রেও জীবিকার জন্য অন্য কাজ করার প্রয়োজন হয়েছিল। শান্তিলালের বক্তব্যে স্পষ্ট, প্রতিভা ও নিষ্ঠা থাকলেও সেই সময়ে থিয়েটারকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া ছিল যথেষ্ট কঠিন সিদ্ধান্ত।
এই প্রসঙ্গে রমাপ্রসাদ বনিকের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়। অন্যদের মতো চাকরি বা ব্যবসার দিকে না গিয়ে তিনি মূলত নাট্যচর্চাকেই আঁকড়ে ছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে আর্থিকভাবে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। রমাপ্রসাদের সংসার চালানোর লড়াই খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন বলে জানিয়েছেন শান্তিলাল। তাঁর কথায়, “উনাকে দেখেছি কি কষ্ট করে উনাকে সংসার করতে হয়েছে। আর সে সময় সেই জায়গাটাও ছিল না যে নাটক করে আর কিছু আসবে।” অভিনয়ের প্রতি এমন গভীর নিষ্ঠা থাকলেও তখন নাটক থেকে বাড়তি আয় করার মতো কোনও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা ছিল না। ফলে থিয়েটারকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব অনেক শিল্পীকেই ব্যক্তিগত ত্যাগ, আর্থিক চাপ এবং নানান প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই সামলাতে হয়েছে।
পরবর্তীকালে বিনোদন জগতে দূরদর্শনের প্রবেশ সেই পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনতে শুরু করে। শান্তিলালের মতে, টেলিভিশন অভিনেতাদের সামনে এমন একটি নতুন ক্ষেত্র খুলে দেয় যেখানে অভিনয়ের বিনিময়ে পারিশ্রমিক পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তখন থিয়েটার চালিয়ে যেতে অনেক সময় শিল্পীদের নিজেদের পকেট থেকেই অর্থ খরচ করতে হত। অন্যদিকে দূরদর্শনে কাজ করে উপার্জন করার সুযোগ তাঁদের জন্য আলাদা একটি পথ তৈরি করে দেয়। এই পরিবর্তনকে অভিনেতা থিয়েটারের বাইরে অভিনয় করে অর্থ উপার্জনের একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে দেখেছেন। অর্থাৎ মঞ্চের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রেখেও শিল্পীরা অন্য মাধ্যমে কাজ করে নিজেদের জীবিকা সামলানোর সুযোগ পান। দূরদর্শনের সেই নতুন দরজা পরবর্তী সময়ে বাংলা বিনোদন জগতের পেশাগত কাঠামো বদলে দেওয়ার পথও তৈরি করে।
এরপর বাংলা টেলিভিশনে মেগা সিরিয়ালের জনপ্রিয়তা আরও বহু অভিনেতা এবং কলাকুশলীর জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। শান্তিলাল মনে করেন, এই ধারার হাত ধরে অভিনয়কে জীবিকা হিসেবে বেছে নেওয়ার সুযোগ অনেকটাই বেড়ে যায়। শুধু কয়েকজন পরিচিত শিল্পী নয়, অসংখ্য নতুন অভিনেতার জন্যও নিয়মিত কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়। ফলে টেলিভিশন ধীরে ধীরে বাংলা বিনোদন শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের জায়গা হয়ে ওঠে। মেগা সিরিয়ালের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে শান্তিলাল স্পষ্টভাবেই এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “থ্যাংকস টু মেগা সিরিয়াল কনসেপ্ট। মেগা সিরিয়াল কনসেপ্ট যদি না আসতো, তাহলে কয়েক হাজার মানুষের আমাদের এখানে অভিনেতা হওয়া হতো না।” তাঁর এই বক্তব্যে উঠে আসে কীভাবে একটি নতুন বিনোদন মাধ্যম বহু মানুষের অভিনয়জীবনের পাশাপাশি তাঁদের রোজগারের পথও তৈরি করেছে।
আরও পড়ুনঃ ‘ওকে নিয়ে রটিয়ে তোমাদের ব্যবসা চলে, আমার না!’ শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রেমের গুঞ্জনে এবার বি*স্ফোরক জিতু কমল! কেন এত ক্ষু’ব্ধ অভিনেতা?
থিয়েটারের সেই সময় আর বর্তমান বিনোদন জগতের মধ্যে তাই বড়সড় পার্থক্য দেখছেন শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়। একসময় মঞ্চে অভিনয় করার জন্য শিল্পীদের নিজেদের অর্থ খরচ করতে হলেও তার বদলে উপার্জনের নিশ্চয়তা প্রায় ছিল না। অভিনয়কে ভালোবেসে বহু মানুষ অন্য পেশার সঙ্গে থিয়েটার চালিয়ে গিয়েছেন। কেউ আবার শুধুমাত্র নাটককে আঁকড়ে থেকে আর্থিক কষ্টের মধ্যেও শিল্পচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। দূরদর্শনের পর মেগা সিরিয়ালের বিস্তার সেই ছবিটাই অনেকটা বদলে দেয়। নিয়মিত টেলিভিশন কাজের ফলে অভিনয় পেশা হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ আগের তুলনায় অনেক বেশি মানুষের সামনে আসে। শান্তিলালের কথায়, থিয়েটারের কঠিন বাস্তবতা থেকে টেলিভিশনের কর্মসংস্থানের এই পরিবর্তন বাংলা অভিনয় জগতের জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
