অভিনেত্রী হিসেবে দীর্ঘদিন দর্শকদের মন জয় করার পর এবার পরিচালনার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছেন চৈতি ঘোষাল। তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি ‘নেভার মাইন্ড’ সদ্য মুক্তি পেয়েছে। এই নতুন পথচলা নিয়ে কথা বলতে গিয়েই এক সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের এমন অনেক অধ্যায় তুলে ধরলেন, যা এতদিন অনেকেরই অজানা ছিল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছেলে অভিনেতা অমর্ত্য রায়ও। নতুন ছবির পরিকল্পনা, কাজের চাপ, পরিবার, সংগ্রাম থেকে শুরু করে জীবনের নানান কঠিন অভিজ্ঞতা, সবকিছু নিয়েই খোলামেলা কথা বলেন মা-ছেলে। সেই আড্ডাতেই উঠে আসে খুব অল্প বয়সে মা হওয়া, বাবা-মায়ের অবদান এবং তাঁদের হারানোর গভীর শূন্যতার কথা।
চৈতি ঘোষাল জানান, মাত্র কুড়ি বছর বয়সের কাছাকাছি সময়েই তিনি মা হন। অভিনয়ের পাশাপাশি তখন সংসার এবং সন্তানকে বড় করে তোলার দায়িত্বও কাঁধে এসে পড়েছিল। সেই সময় তাঁর বাবা-মা পাশে না থাকলে সবকিছু সামলানো সম্ভব হতো না বলেই তিনি স্বীকার করেন। তাঁর কথায়, “২০ বছর বয়সেই মা হয়েছিলাম, বাবা-মা পাশে না থাকলে ছেলেকে মানুষ করতেই পারতাম না।” আজও জীবনের কোনও বড় সুখবর পেলে প্রথমেই বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে যায় বলে জানান তিনি। বাবা মারা যাওয়ার স্মৃতি ভাগ করে তিনি বলেন, “বাবা দীর্ঘদিন অসুস্থ হওয়ার পর মারা গিয়েছেন, অনেক অর্থ ব্যয় হয়েছে আমাদের। ঋত্বিক ঘটকের থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায়ের অগুনতি ছবিতে অভিনয় করেছেন উনি। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে যদি দশটা কালজয়ী ছবির নাম বলা যায়, তার মধ্যে একটাই অন্তত আমার বাবা ছিলেন।
কই তাঁর শেষকালে সরকার তো কোনও সাহায্য করেনি, আমরাও চাইনি!” মা ও বাবর অনুপস্থিতি আজও তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা। অন্যদিকে অমর্ত্যও বলেন, দিদা-দাদুই তাঁর জীবনের প্রথম শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের কাছ থেকেই মানুষকে সম্মান করতে, নম্র থাকতে এবং ভালোবাসতে শিখেছেন। পরিচালক হিসেবে প্রথম ছবি তৈরি করার অভিজ্ঞতা নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেন চৈতি ঘোষাল। তাঁর মতে, একটি ছবি তৈরি করা শুধুই অভিনয় পরিচালনা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা এবং মানসিক চাপ। গল্প নির্বাচন থেকে শিল্পী বাছাই, শুটিং, পোস্ট প্রোডাকশন সবকিছুর দায়িত্বই পরিচালকের কাঁধে থাকে।
তিনি জানান, “আমার জন্মের আগে বাবা-মা একাধিকবার সন্তান হারিয়েছিলেন, তাই…” ছোটবেলা থেকেই জীবনের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা আলাদা ছিল। নতুন কিছু করার সাহস এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা সেখান থেকেই এসেছে বলে মনে করেন তিনি। তাই পরিচালনায় আসার সিদ্ধান্তও ভেবেচিন্তেই নিয়েছেন। এই ছবি শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে নয়, দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং পড়াশোনার পর তৈরি করেছেন বলেও জানান অভিনেত্রী। সাক্ষাৎকারে সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোলিং নিয়েও সরব হন চৈতি ও অমর্ত্য। চৈতির মতে, এখন অনেকেই কাউকে না জেনেই মন্তব্য করে ফেলেন। অনেক সময় মানুষের নিজের হতাশা বা অপূর্ণতাই অন্যকে ছোট করার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, এর জবাব কথায় নয়, কাজের মাধ্যমেই দেওয়া উচিত।
আরও পড়ুনঃ “দুই নারীর রেষারেষি আজকের যুগে শুধুই মিথ, অন্যকে দেখে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে…” নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে প্রচলিত ধারণা ভাঙলেন জয়া আহসান ও চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়! দুই নারী সমাজের যে সম্পর্কেই বাঁধা থাক, কখনও কি একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠতে পারে? কী বললেন অভিনেত্রীরা?
অমর্ত্যও মায়ের সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, যাঁরা কটূক্তি করেন, তাঁদের বেশিরভাগই নিজেদের পরিচয় গোপন রেখেই তা করেন। তাই তাঁদের প্রতি রাগ পুষে রাখার কোনও অর্থ নেই। বরং ক্ষমা করে সামনে এগিয়ে যাওয়াই একজন শিল্পীর জন্য বেশি জরুরি বলে মনে করেন তিনি। কথোপকথনের এক পর্যায়ে অমর্ত্য নিজের কেরিয়ারের কঠিন সময়ের কথাও তুলে ধরেন। ছবি ‘ময়দান’-এ কাজ করার পর নতুন সুযোগের আশা তৈরি হলেও, মুম্বইয়ের একটি বড় প্রজেক্টে শেষ মুহূর্তে বাদ পড়তে হয় তাঁকে। সেই ধাক্কা সহজ ছিল না, কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। অন্যদিকে চৈতি ঘোষাল জানান, জীবনের নানা কঠিন সময়ে কখনও কারও কাছে হাত পাতেননি।
