বাংলা সিনেমার জগৎ একসময় ছিল দর্শকদের অন্যতম প্রধান বিনোদনের মাধ্যম। নতুন ছবি মুক্তি মানেই ছিল সিনেমা হলের সামনে লম্বা লাইন, টিকিটের জন্য হুড়োহুড়ি এবং তারকাদের নিয়ে তুমুল উন্মাদনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গিয়েছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল ফোন এবং ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তারের ফলে এখন অনেকেই মনে করছেন সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার অভ্যাস ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। শুধু দর্শক নয়, চলচ্চিত্র জগতের অনেক অভিজ্ঞ শিল্পীও এই পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। সম্প্রতি বাংলা চলচ্চিত্রের বর্ষীয়ান অভিনেতা চিরঞ্জিত চক্রবর্তীও এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে আলোচনায় উঠে এসেছেন।
বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতাদের মধ্যে চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর নাম অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। আশি ও নব্বইয়ের দশকে একের পর এক হিট ছবি উপহার দিয়ে তিনি দর্শকদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে বাংলা চলচ্চিত্রের উত্থান-পতন খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। তাই বর্তমান সময়ে বাংলা সিনেমার অবস্থা নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণকে অনেকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বাংলা সিনেমা, তারকার জনপ্রিয়তা এবং সিনেমা হলের সংকট নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন অভিনেতা।
সাক্ষাৎকারে চিরঞ্জিত বিশেষভাবে অভিনেতা জিৎ এবং দেবের কাজের ধরন নিয়ে কথা বলেন। তাঁর মতে, জিৎ বরাবরই মূলত কমার্শিয়াল বা বাণিজ্যিক ছবির নায়ক হিসেবেই নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন। তিনি বলেন, জিৎ সাধারণত সেই ধরনের ছবিতেই বেশি কাজ করেছেন, যা বৃহৎ দর্শকশ্রেণির জন্য তৈরি হয়। অন্যদিকে দেবের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন ছবি দেখা গেছে। চিরঞ্জিতের মতে, দেব বাণিজ্যিক ছবির পাশাপাশি ‘সাঁঝবাতি’র মতো কিছু ভিন্নধর্মী ও পরীক্ষামূলক ছবিতেও কাজ করেছেন। ফলে অভিনেতা হিসেবে দেব নিজের কাজের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন বলেই তাঁর মন্তব্য থেকে ইঙ্গিত মেলে।
তবে জিৎকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চিরঞ্জিত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। তাঁর মতে, জিতের প্রকৃত দর্শকশ্রেণি মূলত গ্রাম, মফস্বল এবং ছোট শহরকেন্দ্রিক। এই অঞ্চলগুলিতেই দীর্ঘদিন ধরে জিতের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যে সমস্ত এলাকায় তাঁর ছবির চাহিদা রয়েছে, সেখানেই একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে যে দর্শকদের জন্য ছবি তৈরি হচ্ছে, তাঁদের কাছে সেই ছবি পৌঁছানোর পরিকাঠামোই আর আগের মতো নেই। চিরঞ্জিত বিষয়টিকে ব্যবসার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, একটি পণ্য যদি এমন জায়গার জন্য তৈরি হয় যেখানে সেই পণ্য বিক্রির দোকানই আর নেই, তাহলে সমস্যার সৃষ্টি হবেই। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি বাংলা সিনেমার বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে সিনেমা হলের সংখ্যা কমে যাওয়াকেই দেখছেন।
আরও পড়ুনঃ কো’প পড়ল মহারাজের ওপর! সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নিরাপত্তায় বড় পরিবর্তন, জেড থেকে নামিয়ে দেওয়া হল ওয়াই ক্যাটাগরিতে! কিন্তু কেন?
এই প্রসঙ্গেই ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের উদ্বেগও প্রকাশ করেন চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। তাঁর কথায়, সিনেমা হলকে কেন্দ্র করে যে দর্শক সংস্কৃতি একসময় গড়ে উঠেছিল, তা এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গিয়েছে এবং বাড়িতে বসেই বিভিন্ন মাধ্যমে কনটেন্ট দেখার সুযোগ বেড়েছে। ফলে সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার অভ্যাস ক্রমশ কমছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনও সহজ পথ আছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে অভিনেতা বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন। তাঁর মতে, ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে সিনেমা দেখার সেই ঐতিহ্যবাহী অভিজ্ঞতাই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। চিরঞ্জিতের এই মন্তব্য নতুন করে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ এবং সিনেমা হল সংস্কৃতির অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে।
