বাংলা অভিনয় জগতের প্রবীণ অভিনেত্রী বাসন্তী চট্টোপাধ্যায়কে আজও মনে রেখেছেন দর্শকরা। মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে পর্দা ভাগ করে নেওয়া এই অভিনেত্রী ছোট বয়স থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে একের পর এক চরিত্রে নিজের প্রতিভার ছাপ রেখেছেন তিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অভিনয়ের প্রতি তাঁর টান অটুট ছিল। তবে শেষ বয়সে এসে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। একের পর এক শারীরিক সমস্যা তাঁর জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। অসুস্থতার মধ্যেও যতটা সম্ভব কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
শেষ জীবনে বাসন্তী চট্টোপাধ্যায় ক্যানসার, কিডনি অকেজো হয়ে যাওয়া এবং বার্ধক্যজনিত একাধিক জটিলতায় ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। সেই সময় সবচেয়ে বেশি কষ্টের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় কাছের মানুষদের অনুপস্থিতি। জানা যায়, তাঁর ছেলে-মেয়েদের কেউই সেই সময় চিকিৎসার দায়িত্ব নেননি। ফলে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াটাও তাঁর কাছে সহজ ছিল না। কিন্তু এই কঠিন সময়ে একেবারে একা হয়ে যাননি অভিনেত্রী। তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এমন কিছু মানুষ, যাঁদের সঙ্গে তাঁর রক্তের সম্পর্ক ছিল না। তাঁদের মানবিকতাই শেষ সময়ে তাঁর অন্যতম বড় ভরসা হয়ে উঠেছিল।
বাসন্তী দেবীর চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে তাঁর ড্রাইভার নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন। প্রয়োজনের সময় বন্ধুদের কাছ থেকেও ধার করে চিকিৎসার খরচ চালানো হয়েছিল বলে জানা যায়। এমনকী প্রযোজক স্নেহাশিস চক্রবর্তীও তাঁর অসুস্থতার কথা জানতে পেরে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কখনও কখনও হাসপাতালের বিল মেটানোর দায়িত্বও নিয়েছিলেন তিনি। জীবনের শেষ অধ্যায়ে যখন রক্তের সম্পর্কের মানুষদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাহায্য পাননি অভিনেত্রী, তখন এই কয়েকজন মানুষের সহানুভূতি তাঁর জন্য বড় আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর জীবন যেন দেখিয়ে দিয়ে যায়, সম্পর্ক সবসময় শুধু রক্তের বন্ধনে তৈরি হয় না। কখনও কখনও বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানো মানুষগুলিই সবচেয়ে আপন হয়ে ওঠেন।
২০২৫ সালের ১৩ অগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৮ বছর বয়সে প্রয়াত হন বাসন্তী চট্টোপাধ্যায়। আজ, ১৩ অগস্ট ২০২৬, তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুর এক বছর পরেও তাঁর অভিনয়জীবনের নানা অধ্যায় নতুন করে মনে করছেন অনুরাগীরা। ছোটবেলা থেকে অভিনয়ের শুরু, মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে কাজের সুযোগ এবং দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলা পর্দায় উপস্থিতি তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুধু বড় পর্দা নয়, বাংলা বিনোদন জগতের বিভিন্ন মাধ্যমেও নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি। অভিনয়কে কখনও শুধুমাত্র পেশা হিসেবে দেখেননি, বরং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নিয়েছিলেন।
আরও পড়ুনঃ “কী রকম জঘন্য মেয়ে, ছিঃ!” “বিবেক বলতে কিছুই নেই, ঠিক সমরের মতো…কমলার উচিত ছিল অঞ্জুকে একটা থাপ্প’ড় মা’রা!” বাবা সবে মৃ’ত্যুর মুখ থেকে ফিরেছে, তাঁর পাশে দাঁড়ানোর বদলে কাশ্মীর ঘুরতে যাওয়ার জন্য টাকার আবদার! কমলার বড় মেয়ে অঞ্জুর আচরণে চরম বিরক্ত ‘কমলা নিবাস’-এর দর্শকরা!
বাসন্তী চট্টোপাধ্যায়ের শেষ জীবন তাই শুধু একজন প্রবীণ অভিনেত্রীর মৃত্যুর গল্প নয়, বরং কঠিন সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক মানবিক উদাহরণও। অসুস্থতা এবং আর্থিক সমস্যার মধ্যেও কয়েকজন মানুষ যেভাবে তাঁর পাশে ছিলেন, সেই ঋণ ভোলার নয়। জীবনের শেষ অধ্যায়ে নানা কষ্ট তাঁকে ঘিরে থাকলেও অভিনয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা আজও মনে পড়ে। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই ফিরে দেখা যায় তাঁর দীর্ঘ অভিনয়যাত্রা এবং জীবনের শেষ সময়ের সেই কঠিন অধ্যায়। পর্দায় তাঁর রেখে যাওয়া কাজই আজ তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়। বাসন্তী চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।
