বাংলা বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ মালবিকা সেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর আরও একটি বড় পরিচয় রয়েছে, তিনি একজন প্রশিক্ষিত নৃত্যশিল্পী। ভরতনাট্যম এবং কুচিপুড়িতে দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ রয়েছে তাঁর। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও বিভিন্ন মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করেছেন তিনি। ইন্টারন্যাশনাল কালচারাল রিলেশনস কাউন্সিলেরও তালিকাভুক্ত শিল্পী তিনি। ‘ফাগুন বউ’, ‘শ্রীময়ী’, ‘খড়কুটো’র মতো ধারাবাহিকে অভিনয় করেও দর্শকদের পরিচিত হয়েছেন। তবে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের এমন একটি অধ্যায়ের কথা জানিয়েছেন মালবিকা, যা তাঁর নাচের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে।
মালবিকার ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলির একটি এসেছিল স্বামী সুমিত সেনকে হারানোর পর। পেশায় সাংবাদিক সুমিত তাঁর থেকে প্রায় দশ বছরের বড় ছিলেন। দুজনের দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল বলেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সুমিত সেন ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র কলকাতা ব্যুরোর রেসিডেন্ট এডিটর হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর মালবিকা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। সেই শূন্যতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নেওয়ার পথে তাঁর সবচেয়ে বড় সঙ্গী হয়ে ওঠে নাচ। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, প্রায় ১১ বছর আগে স্বামীকে হারানোর পর নাচই তাঁকে ফের নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে।
মালবিকার কাছে তাই নাচ শুধুমাত্র মঞ্চে পরিবেশনের বিষয় নয়। জীবনের কঠিন সময়ে এই শিল্পই তাঁর কাছে বেঁচে থাকার শক্তি হয়ে উঠেছিল। নিজের এই পরিচয়ের কারণেই অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত হওয়ার চেয়েও নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচয় দিতে তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ। অভিনয় তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও নাচ তাঁর দীর্ঘদিনের সাধনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শ্যামা’, ‘চণ্ডালিকা’ এবং ‘চিত্রাঙ্গদা’র মতো নৃত্যনাট্য পরিবেশনের সময়ও নিজের নৃত্যশৈলী নিয়ে বিশেষভাবে ভাবেন তিনি। কুচিপুড়ি এবং ভরতনাট্যমের প্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে এই পরিবেশনাগুলিকে নিজের মতো করে সাজান। শাস্ত্রীয় নৃত্যের এই দুই ধারার সঙ্গে রবীন্দ্রনৃত্যের মেলবন্ধনই তাঁর পরিবেশনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
দীর্ঘদিন শিল্পচর্চা চালিয়ে যাওয়ার জন্য শুধু প্রতিভা যথেষ্ট নয় বলেই মনে করেন মালবিকা। তাঁর মতে, একজন শিল্পীকে নিয়মিত নিজের শরীর এবং মন দুটোই প্রস্তুত রাখতে হয়। সেই কারণেই নিজের জীবনে কঠোর নিয়ম মেনে চলার ওপর জোর দেন তিনি। নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যকর খাবার তাঁর দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিল্পী হিসেবে এত বছর কাজ করার পরেও নিজেকে তিনি এখনও একজন শিক্ষার্থী হিসেবেই দেখতে চান। নিজের কাজ আরও ভালো করার জন্য পরিবারের সদস্যদের মতামতও গুরুত্ব দিয়ে শোনেন। অর্থাৎ বয়স বা অভিজ্ঞতা যতই বাড়ুক, শেখার জায়গা কখনও শেষ হয়ে যায় না বলেই তাঁর বক্তব্যের মূল সুর।
শুধু নিজের কাজ নয়, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গেও মালবিকার সম্পর্ক তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সেই সুন্দর সম্পর্কের ছবিও উঠে এসেছে। তাঁর ছাত্র সৌরভ চ্যাটার্জির মতো অনেকেই তাঁকে শুধু নাচের শিক্ষিকা হিসেবে দেখেন না। তাঁদের কাছে মালবিকা একইসঙ্গে গুরু এবং অভিভাবকের মতো। শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর স্নেহ এবং তাঁদের কাজ নিয়ে আগ্রহও সেই সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে। নাচ শেখানোর পাশাপাশি তাঁদের জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও পাশে থাকার চেষ্টা করেন তিনি। ফলে শিক্ষক এবং ছাত্রের সাধারণ সম্পর্কের বাইরে তাঁদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনেক বেশি আপন একটি বন্ধন।
আরও পড়ুনঃ পর্দায় যে কণ্ঠে বারবার কেঁপেছে দর্শকের বুক, আচমকাই স্তব্ধ হল সেই স্বর! ৭৫-এ প্রয়াত নানা পাটেকর! কিভাবে মা’রা গেলেন অভিনেতা?
স্বামীকে হারানোর পর যে শূন্যতা তাঁকে একসময় মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল, সেখান থেকেই আবার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি খুঁজে পেয়েছেন মালবিকা। আজও সেই কঠিন সময়ের কথা বলতে গিয়ে তাঁর জীবনে নাচের গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি করে সামনে আসে। অভিনয়ের পরিচিতি বাড়লেও নিজের নৃত্যশিল্পী পরিচয়কে তিনি এখনও সবচেয়ে কাছের বলে মনে করেন। একদিকে শাস্ত্রীয় নৃত্যের নিয়মিত সাধনা, অন্যদিকে অভিনয়ের কাজ, দুটোকেই নিজের জীবনের সঙ্গে ধরে রেখেছেন তিনি। শরীরচর্চা, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং নিয়মিত শেখার অভ্যাস তাঁর শিল্পীজীবনের অন্যতম ভিত্তি। আর ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসা তাঁকে সেই যাত্রাপথে আরও উৎসাহ দেয়। মালবিকার কথায় স্পষ্ট, জীবনের কঠিন অধ্যায় পেরিয়ে তাঁকে আবার দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে নাচ শুধু তাঁর পেশা নয়, তাঁর বেঁচে থাকার শক্তিও।
