কলকাতা শুধু একটি শহর নয়, এটি বাংলার সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য ও চিন্তার অন্যতম কেন্দ্র। যুগের পর যুগ ধরে এই শহর নানা মতাদর্শ, আন্দোলন, সৃষ্টিশীলতা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার সাক্ষী হয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়া এই মহানগরে নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জনজীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও নিয়মিত আলোচনা হয়। শহরের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, কীভাবে তার অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত জায়গাগুলিকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে, সেই প্রশ্নও বারবার উঠে আসে জনপরিসরে।
সম্প্রতি এই ধরনের সামাজিক ও নাগরিক বিষয় নিয়ে নিজের মতামত স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে দেখা গেলো জনপ্রিয় গায়ক, সুরকার শিলাজিৎ মজুমদারকে। তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য নন, কোনও নির্বাচনে প্রার্থীও হননি। তবুও সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অকপটে কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে যেমন সমালোচনা থাকে, তেমনই থাকে গঠনমূলক চিন্তার ইঙ্গিত। ফলে শিল্পী হিসেবে যেমন তিনি পরিচিত, তেমনই একজন স্পষ্টভাষী নাগরিক হিসেবেও তাঁর একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে উঠেছে।
বাংলা আধুনিক গানের জগতে শিলাজিৎ একটি পরিচিত ও জনপ্রিয় নাম। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে আজও তাঁর গান শ্রোতাদের মধ্যে সমানভাবে জনপ্রিয়। গায়ক, গীতিকার, সুরকার একাধিক ভূমিকায় তিনি নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর গানের বিষয়বস্তুতে যেমন প্রেম বা ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা উঠে এসেছে, তেমনই উঠে এসেছে সমাজ, মানুষ এবং সময়ের নানা বাস্তব চিত্র। শিল্পী হিসেবে তাঁর এই স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করেছে। সম্প্রতি সাক্ষাৎকারে কলকাতার উন্নয়ন ও শহর পরিকল্পনা প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শিলাজিৎ বলেন, কলকাতা একটি সম্প্রসারিত হতে থাকা শহর। তাঁর মতে, শহরে এখনও এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেগুলি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। সেই সব জায়গায় কী ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ করা যেতে পারে বা কীভাবে সেগুলিকে আরও কার্যকর করে তোলা যায়, তা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হওয়া দরকার। তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র কোনও একটি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বিতর্ক না করে শহরের সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
একই সাক্ষাৎকারে তথাকথিত ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটির ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। শিলাজিতের বক্তব্য, সমাজে যাঁদের ‘আঁতেল’ বা ‘বুদ্ধিজীবী’ বলা হয়, সেই পরিচয় নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত সংশয় রয়েছে। তাঁর মতে, প্রত্যেক মানুষই নিজের বুদ্ধি ব্যবহার করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। শ্রমজীবী হোন বা অন্য কোনও পেশার মানুষ, শুধুমাত্র শ্রম নয়, কাজের ক্ষেত্রেও বুদ্ধির প্রয়োজন হয়। তাই বিশেষ কিছু মানুষকে আলাদা করে ‘বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি তিনি সহজভাবে মেনে নিতে পারেন না।নিজেকে তিনি ‘বুদ্ধিজীবী’ নয়, বরং ‘ভাবনাজীবী’ বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। শিলাজিতের কথায়, তিনি প্রচুর ভাবেন এবং সেই ভাবনা থেকেই তাঁর সৃষ্টির জন্ম হয়। সেই সৃষ্টির মধ্যে যদি কোনও একটি কাজও মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, তবে সেটাই তাঁর কাছে বড় প্রাপ্তি। এই দর্শন নিয়েই তিনি দীর্ঘদিন ধরে শিল্পচর্চা করে চলেছেন।
আরও পড়ুনঃ কোয়েল মল্লিক কি ছাড়ছেন সাংসদ পদ? প্রশ্ন করতেই ৪ তারিখ বারোটার পর ডিজে বাজাতে বলা সাংসদ জুন মালিয়া কি বললেন জানেন?
রাজনীতিতে যোগদানের প্রসঙ্গেও তিনি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচনে লড়ার প্রস্তাব পেলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। তাঁর মতে, রাজনীতি একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয় এবং এর জন্য বিশেষ প্রস্তুতি ও দক্ষতার প্রয়োজন। শুধু কোনও পদ পাওয়ার জন্য তিনি রাজনীতিতে আসতে চান না। বরং সুযোগ পেলে শিল্পী ও সঙ্গীতজগতের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে আগ্রহী। সরাসরি রাজনীতিতে না থাকলেও সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে বীরভূমের প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের জন্য তিনি নানা উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। একটি স্কুল পরিচালন সমিতির দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। শিলাজিতের বিশ্বাস, কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও সমাজের জন্য ইতিবাচক কাজ করা সম্ভব। শিল্প, সংস্কৃতি এবং মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমেই মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনা যায় আর সেই বিশ্বাসকেই তিনি নিজের কাজ ও বক্তব্যে বারবার তুলে ধরেছেন।
