উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে নিজের জীবনের এক অজানা স্মৃতি ভাগ করে নিলেন অভিনেত্রী সোনালী গুপ্ত। তিনি কিংবদন্তি অভিনেত্রী কাজল গুপ্ত এবং পরিচালক দীনেন গুপ্তর মেয়ে। ছোট থেকেই সিনেমার পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছেন তিনি, ফলে বাংলা ছবির বহু তারকার সঙ্গেই তাঁর পরিচয় ছিল পারিবারিক সূত্রে। পরবর্তীকালে অভিনয়েও পা রাখেন সোনালী এবং ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’, ‘সানাই’, ‘প্রিয়তমা’র মতো ছবিতে কাজ করেন। তাঁর বাবা দীনেন গুপ্ত ছিলেন পরিচালক ও চিত্রগ্রাহক, আর মা কাজল গুপ্ত ছিলেন পরিচিত অভিনেত্রী। সোনালী নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, অভিনয়ে আসাটা তাঁর কাছে অনেকটাই আকস্মিক ঘটনা ছিল। এই সিনেমার পরিবেশেই বেড়ে ওঠার কারণে উত্তম কুমার থেকে শুরু করে সেই সময়ের বহু শিল্পীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতি জমে উঠেছিল।
উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে সেই পুরনো দিনেরই একটি বিশেষ ঘটনা মনে পড়ে যায় সোনালীর। তিনি জানান, বিয়ের আগের দিন তাঁর এবং উত্তম কুমারের দুজনেরই একটি পুরস্কার অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সময় বিয়ের আগের দিন মেয়েদের বাড়ির বাইরে বেরোনো একেবারেই ভালো চোখে দেখা হত না। তাই বাড়ি থেকেও তাঁকে অনুষ্ঠানে যেতে প্রথমে বাধা দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই অনুষ্ঠানে সুচিত্রা সেন উপস্থিত থাকবেন জানতে পেরে শেষ পর্যন্ত বাড়ির লোকজনকে বুঝিয়ে সোনালীকে যেতে দেওয়া হয়। কিন্তু বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছুটা যাওয়ার পরই তাঁর গাড়ি খারাপ হয়ে যায়। সেই মুহূর্তে তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো মায়ের কথা শুনে বাড়িতেই থাকা উচিত ছিল, কিন্তু তখন আর ফিরে যাওয়ার উপায় ছিল না।
শেষ পর্যন্ত একটি ট্যাক্সি জোগাড় করে কোনওরকমে অনুষ্ঠানে পৌঁছন সোনালী। সেখানেই তাঁর দেখা হয় উত্তম কুমারের সঙ্গে। তাঁকে দেখে মহানায়ক মজার ছলেই জানতে চেয়েছিলেন, বিয়ের আগের দিন তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন কেন। পরের দিনই ছিল সোনালীর বিয়ে, আর সেই উপলক্ষে উত্তম কুমার নিজে তাঁর বাড়িতে এসেছিলেন। শুধু অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকেননি তিনি, বিয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে ছবি তোলা এবং অতিথি আপ্যায়নেও অংশ নিয়েছিলেন। তবে খাওয়ার সময় এত লোকজনের মধ্যে তিনি নাকি শান্তিতে খেতে পারবেন না বলে জানান। সেই কারণে বাড়ি থেকেই একটি টিফিন বক্স নিয়ে এসেছিলেন এবং তাতে যেন তাঁর জন্য খাবার দিয়ে দেওয়া হয়, সেই অনুরোধ করেন। সোনালীও সেই অনুযায়ী তাঁর টিফিন বক্সে খাবার দিয়ে দেন।
এরপর সেই টিফিন বক্স নিয়েই তৈরি হয় আরেক মজার স্মৃতি। সোনালী জানান, বিয়ে মিটে যাওয়ার পর বাসর ঘরে তিনি শুনেছিলেন, তাঁর বাড়ি থেকে নাকি এত বড় একটি টিফিন বক্স এসেছিল যাতে দশজনের খাবার ধরে যেতে পারে। সেই টিফিন বক্সটি দেখার জন্যও নাকি বাড়িতে বেশ হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, পরে উত্তম কুমার ফোন করে তাঁর বাবা দীনেন গুপ্তকেও জানিয়েছিলেন যে তিনি তাঁদের বাড়িতে কতটা তৃপ্তি করে খেয়েছেন। এই ছোট্ট ঘটনাটিই সোনালীর কাছে মহানায়কের মানুষ হিসেবে সরলতা এবং আন্তরিকতার একটি বিশেষ স্মৃতি হয়ে রয়েছে। উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যে শুধুই পেশাগত ছিল না, এই ঘটনাতেই তার অন্যরকম ছবি ধরা পড়ে। সিনেমার বড় তারকা হয়েও সাধারণ মানুষের মতো সহজভাবে মিশে যাওয়ার সেই অভ্যাসই আজও সোনালীর মনে দাগ কেটে রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ উলট পুরাণ! উত্তমের শতবর্ষে একই মঞ্চে গান ধরলেন কৌস্তভ-রাজ, মুচকি হাসি শুভশ্রীর!
একই প্রসঙ্গে সোনালী গুপ্ত স্মরণ করেছেন আরেক কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কেও। তিনি জানিয়েছেন, তাঁদের বাড়িতে তৈরি মাছের চপ খুব পছন্দ করতেন সৌমিত্রবাবু। এমনকি অসুস্থ হয়ে পড়ার আগেও তিনি তাঁদের বাড়িতে এসে সেই মাছের চপ খেয়ে গিয়েছেন। শুধু নিজের জন্য নয়, বাড়ির জন্যও সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন সেই খাবার। সোনালীর কথায়, আগেকার দিনের মানুষজনের মধ্যে এমন সরলতা ছিল, যা আজকের দিনে খুব সহজে দেখা যায় না। তিনি মনে করেন, সেই সময়ের মানুষ তারকা হোন বা সাধারণ মানুষ, সকলের মধ্যেই একটা সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হত। উত্তম কুমারের টিফিনের ঘটনা থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মাছের চপ পছন্দ করা, তাঁর কাছে সেই পুরনো দিনের মানুষগুলোর সরলতারই অমূল্য স্মৃতি হয়ে রয়ে গিয়েছে।
