টলিউডের একসময়ের সফল পরিচালক সুজিত গুহ এখন বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। যাদবপুরের সুলেখার কাছে সরকারি আবাসনের একটি ফ্ল্যাটে ভাগ্নে ও ভাগ্নে বউয়ের সঙ্গে থাকেন তিনি। শরীর আগের মতো সঙ্গ না দিলেও স্মৃতিতে আজও অমলিন তাঁর দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনের অসংখ্য অধ্যায়। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সেই অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলে বসেন বর্ষীয়ান পরিচালক। নিজের পরিচালনায় আসার লড়াই থেকে শুরু করে টলিউডের বর্তমান পরিস্থিতি, জনপ্রিয় অভিনেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ইন্ডাস্ট্রির বদলে যাওয়া পরিবেশ নিয়ে অকপটে কথা বলেন তিনি। বিশেষ করে আজকের বাংলা চলচ্চিত্র জগতের পরিবর্তন তাঁকে কতটা কষ্ট দেয়, সেই কথাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
সুজিত গুহ জানান, ছোটবেলায় দাদার এক বন্ধুর ক্যামেরা হাতে পাওয়ার পর থেকেই সিনেমার প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরি হয়। পরিবার প্রথমে এই পেশাকে সমর্থন না করলেও নিজের ইচ্ছায় তিনি এই পথেই এগিয়ে যান। পরে পরিচালক শচীন অধিকারীর কাছে কাজ শেখার সুযোগ পান। এরপর দীনেন গুপ্ত ও তরুণ মজুমদারের সহকারী পরিচালক হিসেবেও দীর্ঘদিন কাজ করেন। তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি ছিল ‘ক্ষ্যাপাঠাকুর’। তবে প্রকৃত সাফল্য আসে তৃতীয় ছবি ‘দাদামণি’ মুক্তির পর। তারপর একের পর এক ‘অমর সঙ্গী’, ‘আশা ও ভালোবাসা’, ‘বন্দিনী’, ‘মন মানে না’ এবং ‘মন যে করে উড়ু উড়ু’-র মতো জনপ্রিয় ছবি উপহার দিয়ে বাংলা ছবির অন্যতম সফল পরিচালকের আসন পাকা করেন তিনি।
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে সুজিত গুহ জানান, বুম্বা তখন মাত্র বারো বছরের ছেলে। তাঁর মা রত্না চট্টোপাধ্যায় একদিন অনুরোধ করেছিলেন ছেলেকে কাজের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। সেই শুরু, তারপর দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছেন তাঁরা। পরিচালকের কথায়, “বুম্বা আর আমি যেন অমর সঙ্গী। আমার কোনও ছবি মানেই বুম্বা।” শুধু প্রসেনজিৎ নন, জিৎ, দেব, অঙ্কুশ হাজরা ও হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি। দেবকে নিয়ে বলতে গিয়ে জানান, প্রথমদিকে অভিনেতা নাকি অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন, ভিতরে ঢুকতে সাহস পেতেন না। পরে তাঁকে নিজেই ডেকে নিয়ে কাজ শুরু করেন। ‘মন মানে না’ ছবির পর থেকেই দেবের বড় স্বপ্ন দেখার মানসিকতা তাঁর নজরে পড়েছিল বলেও জানান পরিচালক।
তবে বর্তমান টলিউডের পরিবর্তনই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় সুজিত গুহকে। তাঁর কথায়, একসময় পরিচালকের সিদ্ধান্তই ছিল শেষ কথা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই জায়গায় প্রযোজকদের প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। কোন অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে নেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্তও অনেক ক্ষেত্রে পরিচালকের হাতে থাকত না। উদাহরণ হিসেবে তিনি ‘মন্দিরা’ ছবির কথা বলেন। সেই ছবিতে প্রযোজক বলিউড অভিনেত্রী সোনমকে নিতে চাইলেও তিনি ইন্দ্রাণী হালদারকেই নায়িকা করার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তাঁর মতে, এই পরিবর্তনের সঙ্গে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। দুর্নীতি বা অনৈতিক কোনও বিষয়ের সঙ্গে আপস করাও তাঁর স্বভাবে ছিল না। সেই কারণেই ধীরে ধীরে পরিচালনা থেকে দূরে সরে যান বলে জানান বর্ষীয়ান এই নির্মাতা।
আরও পড়ুনঃ প্রসেনজিতের সঙ্গে প্রেম করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন রচনা! কিন্তু কেন তাকে পাত্তা দেননি নায়ক? জানেন সেই রোমাঞ্চকর গল্প?
অসুস্থতার সময় ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে কতটা মনে রেখেছে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর দেন সুজিত গুহ। তিনি জানান, অসুস্থ অবস্থায় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত তাঁকে দেখতে এসেছিলেন এবং দীর্ঘ সময় পাশে ছিলেন। এছাড়া শুনেছেন, চিকিৎসার বিষয়েও দেব ও প্রসেনজিৎ নানাভাবে সাহায্য করেছেন। যদিও তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে দেখতে আসতে পারেননি, তবুও সেই নিয়ে তাঁর কোনও অভিমান নেই। প্রসেনজিৎকে নিয়ে তিনি বলেন, “বুম্বা মনে না-ই বা রাখল, আমি ওকে খুব ভালোবাসি।” পদ্মশ্রী পাওয়ার পর প্রসেনজিৎ তাঁকে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি। শেষ পর্যন্ত টলিউডের প্রতি তাঁর ভালোবাসা অটুট বলেই স্পষ্ট করে বলেন, “এটাই আমার কাশী-বারাণসী। এখানেই থেকে যাব।” পাশাপাশি সুস্থ হয়ে উঠতে পারলে আবারও পরিচালনায় ফিরতে চান বলেও আশা প্রকাশ করেন বর্ষীয়ান পরিচালক।
