বিনোদন জগতের ঝলমলে আলোয় যা দেখা যায়, তার বাইরেও থাকে অসংখ্য না-বলা গল্প, সংগ্রাম, প্রত্যাখ্যান, আত্মসমালোচনা এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে গড়ে তোলার লড়াই থাকে শিল্পীদের মধ্যে। সাধারণ দর্শক পর্দায় একজন অভিনেতা বা পরিচালকের কাজ দেখলেও সেই কাজের পিছনে কতটা মানসিক প্রস্তুতি, চর্চা এবং আত্মবিশ্বাস কাজ করে, তা খুব কমই সামনে আসে। আবার শিল্প ও বাণিজ্যের টানাপোড়েন, প্রযোজকদের সিদ্ধান্ত, বাজারের চাহিদা কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাবও বিনোদন জগতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। সম্প্রতি এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে অভিনেতা ও পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায় সেই অন্দরমহলের নানা বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। একইসঙ্গে তিনি বলেছেন অভিনয় শেখানোর বদলে কীভাবে একজন শিল্পীকে ভাবতে শেখানো যায়, কীভাবে নিজেকে চিনে নেওয়া যায় এবং বর্তমান সময়ে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প কোন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
বাংলা বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ তথাগত মুখোপাধ্যায় বরাবরই নিজস্ব ভাবনা ও কাজের জন্য আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন। অভিনেতা হিসেবে যেমন দর্শকদের মন জয় করেছেন, তেমনই পরিচালক হিসেবেও একাধিক প্রশংসিত কাজ উপহার দিয়েছেন। এবার তিনি শুরু করতে চলেছেন একটি অভিনয় ও চলচ্চিত্র বিষয়ক ল্যাব, যেখানে প্রচলিত অর্থে অভিনয় শেখানো হবে না, বরং শেখানো হবে কীভাবে একজন শিল্পী নিজের ভেতরের সংকোচ কাটিয়ে ক্যামেরার সামনে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, অভিনয় ভালো বা খারাপ হয় না, অভিনয় হয় বিশ্বাসযোগ্য কিংবা অবিশ্বাসযোগ্য। সেই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন সঠিক চিন্তাভাবনা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং নিজের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। নতুন প্রজন্মের অভিনেতা, নির্মাতা এবং শিশুদের জন্য আলাদা আলাদা কোর্সের পরিকল্পনাও করেছেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে বর্তমান সমাজ এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা নিয়েও খোলামেলা মত প্রকাশ করেছেন তথাগত। তাঁর কথায়, তিনি কখনও কারও তর্জন-গর্জন বা চাপ মেনে চলার মানুষ নন। ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এই অভিনেতার মতে, প্রত্যেক মানুষের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে এবং সেই স্বাধীনতাকে সম্মান করা জরুরি। একইসঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন যে জীবনে সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেননি। অনেক ভুলও করেছেন। তবে সেই ভুলগুলোকে অস্বীকার না করে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, শেখার কোনও শেষ নেই এবং কোনও নির্দিষ্ট বয়সও নেই শেখার জন্য। মানুষ যখনই ইচ্ছা করবে, তখনই নতুন কিছু শিখতে পারে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল সঠিক শিক্ষক ও সঠিক চর্চার পরিবেশের অভাব, যা নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অভিনেতা তথাগত মুখোপাধ্যায় বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকার পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে খোলামেলা মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, নতুন সরকার এলে বাংলা সিনেমা ও বিনোদন জগতে আবারও বড় ধরনের বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, যা ইন্ডাস্ট্রিকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। একইসঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে প্রাক্তন সরকারের সময় থেকেই বিনিয়োগের ধারা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছিল, যার প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে টলিউডে দেখা যাচ্ছে। তাঁর দাবি, অনেক পুরনো প্রযোজক এখন আর সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন না, ফলে নতুন ছবির সংখ্যা কমে গিয়ে ইন্ডাস্ট্রি কার্যত সংকটের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিকে তিনি সাময়িক বললেও, সঠিক লগ্নি এবং নীতিগত সমর্থন ছাড়া বাংলা সিনেমার পুনরুজ্জীবন কঠিন হবে বলেও মত প্রকাশ করেছেন।
আরও পড়ুনঃ “মাঝেমধ্যে মনে হয় জিৎ যেন উজির নিজের দাদা!” “আরাত্রিকা ও ফাহিম যেভাবে সম্পর্কটা ফুটিয়ে তুলেছেন, সত্যিই অসাধারণ!” দুই বোনের টানাপোড়েনের মাঝেই দর্শকদের মন জিতছে উজি-জিৎ-এর সম্পর্ক! ‘জোয়ার ভাঁটা’র এই জুটিই মন ছুঁয়ে যাচ্ছে দর্শকদের!
বাংলা সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হলেও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে যথেষ্ট বাস্তববাদী তথাগত। তাঁর মতে, প্রযোজক যদি আগে থেকেই গল্প, অভিনেতা কিংবা ছবির কাঠামো নির্ধারণ করে দেন, তাহলে পরিচালকের সৃজনশীলতা বাধাপ্রাপ্ত হয়। তিনি কখনও আপস করেননি, তবে প্রয়োজন অনুযায়ী সমঝোতা করেছেন বলে জানান। একজন দুর্বল অভিনেতাকে নিয়েও দীর্ঘ ওয়ার্কশপের মাধ্যমে ভালো পারফরম্যান্স বের করে আনার উদাহরণও দেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই সম্ভাবনা থাকে, তবে সেই সম্ভাবনাকে সঠিক ভাষা এবং সঠিক দিশা দেওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাঁর নতুন ল্যাবের মূল লক্ষ্যও হবে মানুষকে অভিনয় শেখানো নয়, বরং ভাবতে শেখানো, নিজেকে আবিষ্কার করতে শেখানো এবং ক্যামেরার সামনে নিজের সেরা সংস্করণটিকে তুলে ধরতে সাহায্য করা। আর সেই পথেই তিনি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য একটি সুস্থ ও সৃজনশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে চান।
