সিনেমাহল ফাঁকা, আর মোবাইলের পর্দা ভরতি বিনোদন—এই ছবিটাই এখন সবচেয়ে চেনা। উৎসবের সময় ছাড়া নতুন ছবি মুক্তি দিতেই ভয় পাচ্ছেন প্রযোজকেরা, কারণ বেশির ভাগ ছবিই দর্শক টানতে ব্যর্থ। প্রশ্ন উঠছে, কেন ক্রমশ বড়পর্দা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে দর্শক? কেউ বলছেন গল্পের দুর্বলতা, কেউ নতুন ভাবনার অভাব। তবে বড় একটা অংশ মনে করছেন, সমাজমাধ্যমেই লুকিয়ে আছে এই বদলের আসল সূত্র।
আজকের দিনে তারকারা আর অধরা নন, বরং ‘হাতের মুঠোয়’। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন, ভ্রমণ, খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে আবেগ—সবই রোজকার রিল আর পোস্টে ধরা পড়ছে। ফলে দর্শক ঘরে বসেই তাঁদের দেখতে পাচ্ছেন, বাসে ট্রেনে মেট্রোয় স্ক্রল করলেই মিলছে সেই অভিজ্ঞতা। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, যখন বিনা পয়সায় এত কাছ থেকে দেখা যাচ্ছে, তখন টিকিট কেটে হলে গিয়ে দেখার আকর্ষণ কি কমছে?
অভিনেত্রী শতাব্দী রায় এই প্রবণতায় খুশি নন। তাঁর মতে, একসময় তারকাদের দেখতে হলে সিনেমাহলে যেতে হত, সেই দূরত্বই তৈরি করত আকর্ষণ। এখন সেই রহস্য ভেঙে গেছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, যদি তারকাকে রোজকার জীবনে দেখা যায়, তবে বড়পর্দার জাদু কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। তাঁর কথায়, শক্তিশালী ‘স্টার পাওয়ার’ না থাকলে ছবি টিকিয়ে রাখতে হলে গল্পই শেষ ভরসা।
এই প্রসঙ্গে বারবার উঠে আসে উত্তম কুমার-এর উদাহরণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, তারকার ব্যক্তিগত উপস্থিতি যত কম হবে, দর্শকের কৌতূহল তত বাড়বে। সেই ভাবনাই প্রতিফলিত হয়েছিল সত্যজিৎ রায়-এর ‘নায়ক’ ছবিতেও। তখন তারকারা ছিলেন একরকম রহস্যময়, প্রায় ঈশ্বরতুল্য। আজকের দিনে সেই ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে।
অন্যদিকে, অভিনেতা ও প্রযোজক দেব মনে করেন, সমাজমাধ্যমই সমস্যার মূল নয়। তিনি নিজে ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে কাজের প্রচারেই বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, ছবির গল্প শক্তিশালী হলে দর্শক এখনও হলে যান। একই সুর শোনা যায় নুসরত জাহান-এর কথাতেও। তিনি মনে করেন, তারকার ব্যক্তিগত উপস্থিতি নয়, বরং চিত্রনাট্য আর উপস্থাপনাই দর্শক টানার মূল চাবিকাঠি।
পরিচালক অরিন্দম শীল বিষয়টিকে দেখছেন সময়ের পরিবর্তন হিসেবে। তাঁর মতে, এখনকার প্রজন্মকে টানতে হলে সমাজমাধ্যমের ব্যবহার জরুরি। অমিতাভ বচ্চন বা দীপিকা পাড়ুকোন নিয়মিত অনলাইনে সক্রিয় থাকলেও তাঁদের ছবি কিন্তু দর্শক দেখছেন। তাই নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই এগোতে হবে বলেই মত তাঁর।
প্রযোজক রানা সরকার আবার একটু ভিন্ন কথা বলছেন। তাঁর মতে, সমাজমাধ্যমে জনপ্রিয়তা ছবির প্রচারে সাহায্য করলেও, অতিরিক্ত উপস্থিতি উল্টো প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বরং এমন অভিনেতাদের পছন্দ করেন, যাঁরা পর্দার বাইরে কম দৃশ্যমান—কারণ তাতেই দর্শকের আগ্রহ বজায় থাকে।
নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রী ঋতাভরী চক্রবর্তী মনে করেন, সফলতার চাবিকাঠি এখনও গল্প আর উপস্থাপনাতেই। তিনি উদাহরণ টানেন রণবীর কাপুর এবং রণবীর সিং-এর। কেউ কম সক্রিয়, কেউ অত্যন্ত সক্রিয়—তবুও দুজনেরই ছবি দর্শক দেখেন। তাঁর মতে, ভালো গল্প থাকলে দর্শক বারবার হলমুখী হন।
অভিনেতা সোহম মজুমদার মনে করিয়ে দেন, করোনা পরবর্তী সময়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের অভ্যাসও বড় কারণ। এখন দর্শক জানেন, কিছুদিন অপেক্ষা করলেই ঘরে বসে ছবি দেখা যাবে। ফলে হলমুখী হওয়ার তাড়না কমেছে। তবে তিনি সমাজমাধ্যমকে দায়ী করতে নারাজ।
গায়িকা অন্তরা মিত্র বিষয়টিকে একটু কটাক্ষের সুরেই দেখছেন। তাঁর মতে, এখন সব কিছুই ‘কনটেন্ট’, এমনকি ব্যক্তিগত মুহূর্তও। তবে তিনি এটাও মানেন, লাইভ পারফরম্যান্স বা পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতার জন্য এখনও দর্শক টিকিট কেটে যান—সেটা সমাজমাধ্যম পুরোপুরি বদলে দিতে পারেনি।
আরও পড়ুনঃ কালবৈশাখীর দাপটে আবহাওয়া ঠান্ডা, মন করছে খিচুড়ি খিচুড়ি! নিরামিষ দিনেই বানিয়ে ফেলুন সুগন্ধি ভুনা খিচুড়ি আর লাবড়ার জুটি! জমুক বাঙালির দুপুর, বদলে দিন একঘেয়ে মেনু! জেনে নিন সহজ রেসিপি!
সব মিলিয়ে স্পষ্ট, বড়পর্দার আকর্ষণ হারিয়ে যায়নি, বরং বদলে গেছে তার রূপ। এখন শুধু তারকা নয়, গল্প, প্রচার, প্ল্যাটফর্ম—সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন সমীকরণ। প্রশ্নটা তাই থেকে যায়—তারকা বড়, না কনটেন্ট? উত্তর খুঁজছে সময়ই।
