বাংলার জনপ্রিয় অভিনেতা বিশ্বনাথ বসু (Biswanath Basu) নিজের অভিনয় জীবনের পাশাপাশি বরাবরই নিজের শিকড় ও পারিবারিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের গ্রামের প্রতি ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। অভিনেতার কথায়, জীবনে তিনি নিজের সন্তান ও স্ত্রীকেও যতটা ভালোবাসতে পারেননি, তার থেকেও বেশি ভালোবাসেন নিজের গ্রামকে। উত্তর ২৪ পরগনার আরবেলিয়া গ্রামের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু জন্মভূমির নয়, এক গভীর আবেগেরও। প্রায় ১৭২৫ সাল থেকে তাঁদের পরিবার এই গ্রামের সঙ্গে যুক্ত বলে জানান তিনি। এই গ্রাম, বাড়ি এবং পারিবারিক ঐতিহ্য তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলেও উল্লেখ করেন অভিনেতা। তারকা হওয়ার পরও গ্রামের প্রতি এই টান আজও একই রয়ে গিয়েছে বিশ্বনাথের।
নিজের গ্রামের কথা বলতে গিয়ে বিশ্বনাথ বসু জানান, সেখানে যেমন ভালো লাগার অনেক কিছু রয়েছে, তেমনই কিছু খারাপ লাগার বিষয়ও আছে। তবে কোন বিষয় তাঁকে কষ্ট দেয়, সেই সম্পর্কে বিস্তারিত না বললেও গ্রামের প্রতি তাঁর গভীর মায়ার কথা স্পষ্ট করেছেন অভিনেতা। তিনি বলেন, গ্রাম ছেড়ে আসার ইচ্ছে কখনও হয় না, কারণ সেখানে রয়েছে এক অন্যরকম শান্তি। বাড়ির বড় বারান্দায় বসে গাছের পাতার শব্দ ও পাখির ডাক শুনলে তাঁর মনে হয়, এমন নিষ্পাপ ও নির্মল জায়গা পৃথিবীতে আর নেই। শহরের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও গ্রামের সেই শান্ত পরিবেশ তাঁকে বারবার টেনে নিয়ে যায়। বিশ্বনাথের কাছে আরবেলিয়া শুধু একটি ঠিকানা নয়, তাঁর আবেগ, স্মৃতি এবং পরিচয়ের অংশ। সেই কারণেই সুযোগ পেলেই তিনি নিজের গ্রামে ফিরে যান।
অভিনেতা জানান, তাঁদের পরিবারের রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য এবং ইতিহাস। বাড়ির প্রাচীন দুর্গাপুজো, দুর্গা দালান, রাধাকৃষ্ণ মন্দির এবং গ্রামের পুকুর আজও তাঁদের পরিবারের গর্বের বিষয়। ১৭৭৫ সালে শুরু হওয়া সেই দুর্গাপুজো এখনও একই নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয় বলে জানান তিনি। পরিবারের পুরনো রীতি অনুযায়ী ১০০৮টি বেলপাতা দিয়ে বিশেষ হোমের প্রথাও রয়েছে। একসময় সেখানে মহিষ বলির রীতিও ছিল বলে নিজের পারিবারিক ইতিহাসের কথা তুলে ধরেন অভিনেতা। তাঁর মতে, এই সব ঐতিহ্য শুধু সম্পত্তি নয়, এগুলি তাঁদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া দায়িত্ব। এই কারণেই গ্রামের প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে তাঁর আলাদা আবেগ জড়িয়ে রয়েছে।
বিশ্বনাথ বসু আরও জানান, ছোটবেলা থেকেই তাঁর বাবা তাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। বাবা বলেছিলেন, গ্রামের এত সম্পত্তি তিনি বা তাঁর ঠাকুরদা তৈরি করেননি। তাই সেই সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়ার কোনও অধিকারও তাঁদের নেই। বাবার সেই কথা আজও অভিনেতার মনে গভীরভাবে গেঁথে রয়েছে। তিনি মনে করেন, পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সম্পদ রক্ষা করা পরিবারের দায়িত্ব। শুধু নিজের বাড়ি নয়, গ্রামের মানুষের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক রয়েছে দীর্ঘদিনের। গ্রামে গেলে নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত, সকলের সঙ্গেই কথা বলেন এবং নিজের দায়িত্বের অংশ হিসেবেই তাঁদের পাশে থাকার চেষ্টা করেন।
আরও পড়ুনঃ ‘স্কিনটোন একদম কালো ছিল! উড়ে পুরুত যাকে বলে! ক্রিম মেখে, ক্যাপসুল খেলে ফর্সা হয়েছিলেন!’ ফুটেজ পেতে মহানায়ককে নিয়ে মিথ্যাচার করছেন নাতনি নবমিতা, রোষ নেট পাড়ায়
বিশ্বনাথ বসুর পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে বাংলার ইতিহাসেরও যোগ রয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উপেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন, যিনি বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর মামলায় আইনজীবী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এছাড়াও নরেন্দ্রচন্দ্র বসু এবং রামরাম বসুর মতো ব্যক্তিদের কথাও নিজের পারিবারিক ইতিহাসে তুলে ধরেছেন অভিনেতা। বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে এই যোগসূত্রকে তিনি বিশেষ গর্বের বিষয় বলে মনে করেন। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে অভিনয় জগতে পরিচিত মুখ হলেও নিজের গ্রামের টান তিনি কখনও ভুলে যাননি। বিশ্বনাথের কাছে জনপ্রিয়তার থেকেও বড় তাঁর নিজের শিকড় ও ঐতিহ্য। আর সেই কারণেই আজও একজন তারকা হয়েও গ্রামের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট রয়েছে।
