বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে ফের আলোচনার কেন্দ্রে কবীর সুমন। একসময় তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে বহু আলোচনা হলেও এবার শিল্পীর সাম্প্রতিক মন্তব্যে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “আমি তো তৃণমূলের সদস্য নই, আমি তৃণমূলপন্থীও নই।” এই বক্তব্য সামনে আসতেই সমাজমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে, এতদিন যাঁকে তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ মুখ হিসেবে দেখা হত, তিনি কি এখন নিজের অবস্থান বদলালেন? গত মার্চ মাসে ধর্মতলার ধরনা মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে এসআইআর ইস্যুতে সরব হয়েছিলেন তিনি। সেই ঘটনার পর এত দ্রুত সুর বদল কেন, তা নিয়েই এখন জোর চর্চা চলছে। রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই মন্তব্য নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ভোট-পরবর্তী বাংলার আবহে তাঁর এই মন্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দীর্ঘ পনেরো বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলার ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রাজ্যে প্রথমবার পদ্মফুল ফোটার পর রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে। বাংলার অতীত নির্বাচনী ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, পরিবর্তনের ভোটে শাসকদল বড় ধাক্কা খায়। ২০১১ সালে যেমন বামফ্রন্টের পতন হয়েছিল, তেমনই এবার তৃণমূলও বড় ধাক্কা খেল। এই পরিস্থিতিতেই সামনে আসে কবীর সুমনের বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর তাঁর বক্তব্য ঘিরে নেটমাধ্যমে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। অনেকে মনে করছেন, বাংলার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে রেখেই তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। আবার অন্য অংশের দাবি, তিনি বরাবরই স্বাধীন রাজনৈতিক চিন্তার মানুষ। ফলে তাঁর মন্তব্য ঘিরে দ্বিমতও তৈরি হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে কবীর সুমন জানান, “আমায় মমতা প্রায় হাতেপায়ে ধরে দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁর আগে আমি কোনও পার্টির সদস্যও ছিলাম না। আমার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই আমি পদত্যাগ করি।” এই মন্তব্যে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, দলীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশ ব্যক্তিগত উদ্যোগে নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরোধেই হয়েছিল। পাশাপাশি তিনি জানান, সক্রিয় রাজনীতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি আর সেই পথে থাকেননি। দীর্ঘদিন ধরে অনেকেই তাঁকে তৃণমূলের মুখ হিসেবে দেখলেও তিনি এবার নিজের দূরত্বের কথা প্রকাশ্যে বললেন। এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে তাঁর পুরনো ভূমিকা নিয়ে। তিনি কি কখনও দলীয় রাজনীতিতে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেননি, সেই প্রশ্নও উঠছে। তাঁর বক্তব্যে সেই ইঙ্গিত দেখছেন অনেকে।
নির্বাচনের ফল নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে সুমন বলেন, “যেভাবে ভোটটা হল, হঠাৎ সামরিক বাহিনী ঢুকল। ভাবতে পারিনি যে, ট্যাঙ্ক ঢুকবে।” যদিও তিনি বলেন, জনাদেশ কেন মমতার বিরুদ্ধে গেল, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন না। তবে তাঁর মতে, একাধিক ভুলের ফলেই মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “চাকরির ক্ষেত্রটা ভয়ংকরভাবে মার খেয়েছে। মানুষ সেটা ভালো চোখে নেননি।” পাশাপাশি তিনি স্বীকার করেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সব কাজ ঠিক করেছেন? উত্তর না।” আবার একই সঙ্গে তিনি জানান, “আমি এবারও তৃণমূলকে ভোট দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু আমি তৃণমূলের কাজে খুশি হতে পারিনি।” তাঁর মতে, দলের কিছু আচরণেও মানুষ ধাক্কা খেয়েছে। এই মন্তব্য এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুনঃ অরূপের হারের পর টলিপাড়ায় নতুন জল্পনা, ফেডারেশনে কি আসছে পালাবদল? স্বস্তি, শঙ্কা আর বদলের দাবিতে সরব বাংলা ইন্ডাস্ট্রি
তবে সমালোচনার পাশাপাশি মমতা সরকারের কিছু কাজের প্রশংসাও করেছেন কবীর সুমন। তিনি বলেন, “সবুজসাথী, বাচ্চারা সাইকেল পেয়েছে। এটা কতবড় কাজ। এসব কাজের পর হয়তো একদিন মমতার একটা মন্দির হবে।” নতুন সরকারকেও শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, “সিপিএম বা তৃণমূল আমলে মেয়েদের নিরাপত্তা কিন্তু সুনিশ্চিত ছিল। আমি আশা করব, নতুন সরকার যেন সেই ধারা বজায় রাখেন।” একই সঙ্গে তাঁর আরও মন্তব্য, “এখনও ভোট হলে আমি তৃণমূলকেই দেব। তবে সেরকম কোনও কমিউনিস্ট পার্টি এলে আমি এই বুড়ো বয়সেও তাঁদের সদস্য হওয়ার চেষ্টা করব। আমি তাঁদের জন্য গান বাঁধব। তাঁদের পাশে থাকব।” এই মন্তব্যের পর অনেকেই মনে করছেন, তিনি কি এবার প্রকাশ্যে বামপন্থী ঝোঁকের কথাই জানালেন। ফলে কবীর সুমনের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
