রাজ্য নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর টলিপাড়ায় এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা একটাই, ফেডারেশনের নেতৃত্বেও কি বদল আসতে চলেছে? টালিগঞ্জ কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী অরূপ বিশ্বাসের হার ঘিরে সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। কারণ বহু বছর ধরেই ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস এবং তাঁর প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা ছিল ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে। বহু শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক মনে করছেন রাজনৈতিক পালাবদলের পর সংগঠনেও পরিবর্তন দরকার। অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলছেন, আবার অনেকে এখনও সতর্ক। কারণ অতীতে মত প্রকাশের জেরে কাজ হারানোর অভিযোগও উঠেছে। টলিপাড়ার একাংশের মতে, এখন এমন একজন নেতৃত্বে আসা উচিত যিনি ইন্ডাস্ট্রির কাজ বোঝেন এবং সবার কথা শুনে সিদ্ধান্ত নেন। আবার অন্য অংশ অপেক্ষা করছে গিল্ড সদস্যদের বৈঠকের দিকে। ফলে টলিউডে এখন বদল নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।
পরিচালক সুদেষ্ণা রায় জানিয়েছেন, ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মুখ খোলার পর গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর কাজ নেই। পরিবর্তন এলে খুশি হবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সবটাই সময়ের উপরে ছেড়ে দিচ্ছি।” এরপরই তাঁর স্পষ্ট মন্তব্য, “ব্যক্তিগত মতামত জানাতে গিয়ে গত দেড় বছর ধরে কাজ নেই। তাই এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করব না। তা হলে হয়তো সারা জীবনের মতো কাজ হারাতে হবে।” তিনি আপাতত পরিস্থিতি দেখে যেতে চান। একইভাবে পরিচালক ও অভিনেতা অয়ন সেনগুপ্তও বলেন, অন্যায় দীর্ঘদিন টেকে না, ভোটের ফলেই তা প্রমাণ হয়েছে। তিনি জানান, “সেটা সময় বলবে। সংগঠনের নির্বাচন সেই সিদ্ধান্ত নেবে। তার থেকেও বড় কথা, সব ক’টি গিল্ডের সদস্যরা এই বিষয়ে মতামত জানাবেন। তবেই কোনও পদক্ষেপ করা সম্ভব।” তাঁর আশা, এমন কেউ দায়িত্ব নিন যিনি সবাইকে নিয়ে কাজ করবেন।
অয়ন আরও বলেন, সবাই যেন কাজ পান এবং ইন্ডাস্ট্রিতে আবার ব্যস্ততা ফিরে আসুক। তাঁর কথায়, “আগের মতো দম ফেলার ফুরসত যেন না পাই আমরা।” অন্যদিকে ছোটপর্দার পরিচালক সৃজিত রায় অতীতে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে চর্চা হয়েছিল। সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তখন পরিস্থিতি অন্য ছিল। আমার ক্ষমা চাওয়ার উপরে অনেকে নির্ভর করে ছিলেন। অনেকের অন্ন-সংস্থান আটকে ছিল। তাই বৃহত্তর স্বার্থে যদি ক্ষমা চাইতেই হয়, তাতে কোনও আক্ষেপ নেই।” পাশাপাশি তিনি চান, ইন্ডাস্ট্রি রাজনীতির বাইরে থাকুক। তাঁর বক্তব্য, “ইন্ডাস্ট্রির এমন কেউ এই দায়িত্ব নিন, যিনি কাজের মর্ম বোঝেন। মন থেকে সকলের মঙ্গল চান। তবেই ইন্ডাস্ট্রির মঙ্গল।” অর্থাৎ পরিচালকদের বড় অংশই এখন প্রশাসনিক পরিবর্তনের পক্ষে মত দিচ্ছেন।
অভিনেত্রী পায়েল সরকার কোনও ব্যক্তির নাম না করলেও টলিউডে ‘ব্যান’ সংস্কৃতি বন্ধ হওয়ার দাবি তুলেছেন। তিনি বলেন, “যিনি ইন্ডাস্ট্রিকে বুঝবেন, ইন্ডাস্ট্রির মানুষগুলোকে বুঝবেন, এমন কাউকে চাইছি। তিনি প্রচুর কাজ নিয়ে আসবেন, এমন স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি, সংগঠনের শীর্ষে বসে থাকা মানুষটির হাত ধরে সবাই কাজ পাবেন। কাউকে বসে থাকতে হবে না। বাংলা বিনোদনদুনিয়া আবার তার হারানো কৌলিন্য ফিরে পাবে।” অভিনেত্রী রূপাঞ্জনা মিত্রও প্রায় একই সুরে বলেন, “নন্দনে আবার যাতে সবাই শো পান, সেটা চাই। কাজের নির্দিষ্ট সময় থাকুক। নির্দিষ্ট সময়ে পারিশ্রমিক পান শিল্পী এবং কলাকুশলীরা। প্রযোজক তাঁর লগ্নির টাকা ফেরত পান আগের মতো। আর ব্যবসায়িক স্বার্থে রিমেক ছবি তৈরি হোক আবার, আপাতত এগুলো পেলেই খুশি।” তাঁর মতে, যোগ্য ও নিয়ম জানা মানুষকেই দায়িত্বে বসানো উচিত।
আরও পড়ুন: “এবার যেন…” আরজি কর কাণ্ডের নির্যা’তিতা ‘অভয়া’র মা, জয়ী হতেই আবেগঘন প্রতিক্রিয়া শ্রুতির! রত্না দেবনাথের প্রশংসা করে, ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যে কী চাইলেন ‘জোয়ার-ভাটা’র নিশা?
প্রযোজক অশোক ধনুকা, রানা সরকার ও পীযূষ সাহাও জানিয়েছেন, আগের নানা নিয়মকানুনে ছবি তৈরি কঠিন হয়ে উঠেছিল। তাঁদের দাবি, দ্রুত নেতৃত্বে বদল আনা হোক। অশোক ধনুকা চান ইন্ডাস্ট্রির কেউ দায়িত্ব নিন, যিনি প্রযোজকদের সমস্যাও বুঝবেন। রানা সরকার বলেন, “রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক, যিনিই আসুন না কেন, তিনি যেন ইন্ডাস্ট্রিকে বোঝেন। আমাদের কাজ জানা লোক চাই।” ম্যানেজার গিল্ড ও ভেন্ডার গিল্ডের প্রতিনিধিরাও বলেন, “বদল চাই। এ আবার বলতে হবে? অবশ্যই বদল চাইছি। চাইছি, কাজের লোক আসুন। এই বদল শীঘ্রই আসছে।” এদিকে স্বরূপ বিশ্বাস বলেন, “পরিস্থিতি পুরোটাই নির্ভর করছে গিল্ডের সদস্যদের উপরে, যা আলোচনাসাপেক্ষ। টেকনিশিয়ানরা যা চাইছেন, সেটা জানাবেন।” আরও বলেন, “বরাবর কলাকুশলীদের নিয়ে কাজ করার কথা বলেছি। তার জন্য অনেকের হয়তো আমার কথা খারাপ লেগেছে।” আর গুপি শুটিং প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, “কেউ যদি কলাকুশলী কম নিয়ে বা না নিয়ে কাজ করতে চান, তখন বিষয়টি দেখা যাবে।” এখন সবার নজর আসন্ন বৈঠকের দিকে।
