বাংলা চলচ্চিত্র জগতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নানান অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারির পর। টলিপাড়ার একাংশের দাবি, এতদিন যে প্রভাবশালী গোষ্ঠী শিল্পের বিভিন্ন স্তরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল, তাদের কর্মকাণ্ড এখন একে একে প্রকাশ্যে আসছে। এই আবহেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে পরিবেশক শতদীপ সাহার একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগকে কেন্দ্র করে। তাঁর দাবি, ছবি মুক্তি থেকে শুরু করে হল বণ্টন, প্রদর্শনের সুযোগ পাওয়া কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ছবিকে বাধার মুখে ফেলার মতো বিষয়গুলির পিছনে দীর্ঘদিন ধরে একটি অস্বচ্ছ ব্যবস্থা কাজ করেছে।
স্বরূপ বিশ্বাস ও ইম্পার সভাপতি পিয়া সেনগুপ্তের নাম উঠে এলেও, ইন্ডাস্ট্রির অনেকের মতে বিষয়টি শুধু কয়েকজন ব্যক্তিকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রতি শতদীপ সাহা দাবি করেন, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউটের পড়ুয়াদের তৈরি ছবি “দ্য অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস” মুক্তি দিতে গিয়ে তাঁকে বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ দিতে হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, প্রায় ১৩ লক্ষ টাকার লেনদেন হয়েছিল এই প্রক্রিয়ায়। একইসঙ্গে তিনি আরও দাবি করেছেন, “দ্য কেরালা স্টোরি” এবং “দ্য বেঙ্গল ফাইলস”-এর মতো ছবির প্রদর্শন নিয়েও বিভিন্ন স্তরে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।
শতদীপের বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কোন ছবি কতটা সুযোগ পাবে, কোন প্রযোজককে সুবিধা দেওয়া হবে এবং কাকে কোণঠাসা করে রাখা হবে। এই অভিযোগ ঘিরেই এখন নতুন করে চর্চায় এসেছে ইন্দ্রনীল নামটি। ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে অনেকেই মনে করছেন, দৃশ্যপটের সামনে যাঁদের দেখা যেত, তাঁদের বাইরেও আরও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন যারা বিভিন্ন সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, চলচ্চিত্রের প্রচার, প্রিমিয়ার, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ইন্ডাস্ট্রির নানা প্রশাসনিক বিষয়ে কিছু ব্যক্তি অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতেন।
যদিও এই অভিযোগগুলির কোনওটিই এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তবুও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর সেই সমস্ত নাম নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। টলিউডের ভেতরে বহু বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, অসন্তোষ ও অভিযোগ এখন সামাজিক মাধ্যমেও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। এই বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে বাংলা ছবির প্রচার ও বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রসঙ্গও। ইন্ডাস্ট্রির অনেকের মতে, আধুনিক চলচ্চিত্র বিপণনের বদলে এখনও অনেক ক্ষেত্রে পুরনো ধ্যানধারণার উপর নির্ভর করা হয়।
পর্যাপ্ত পেশাদার মার্কেটিং, দক্ষ জনসংযোগ সংস্থা কিংবা সুসংগঠিত প্রচার কৌশলের অভাবের কারণে ভালো ছবিও দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারে না। প্রযোজকদের একাংশ এখনও প্রচারকে বিনিয়োগের পরিবর্তে অতিরিক্ত খরচ হিসেবে দেখেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে বাংলা ছবির বক্স অফিসে ধারাবাহিক সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবেও এই বিষয়টিকে তুলে ধরা হচ্ছে। এদিকে স্বরূপ বিশ্বাসকে ঘিরে তদন্ত চলার মধ্যেই শিল্পী মহলের একাংশ দাবি তুলেছেন, শুধু একজন বা দু’জনকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
আরও পড়ুনঃ “বিজেপি করি! রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বহু কাজ মেলেনি, তবে ভ’য় পেয়ে শিরদাঁড়া বিক্রি করিনি” টলিউডে চা’পের রাজনীতির কারণে কাজ হারিয়ে কতটা কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন সুমন ব্যানার্জি?
তাঁদের মতে, গোটা ব্যবস্থার স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। শতদীপ সাহার অভিযোগে উঠে আসা “১৩ লক্ষ টাকার ক্যাশ লেনদেন”, “দ্য কেরালা স্টোরি” বন্ধ করতে হলমালিকদের হুমকি”, এবং “সিন্ডিকেট রাজ”-এর মতো অভিযোগগুলিও এখন আলোচনার কেন্দ্রে। টলিউডের বহু শিল্পী ও স্বাধীন নির্মাতা মনে করছেন, এই বিতর্কের শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে পারলেই বোঝা যাবে বহুদিন ধরে প্রচলিত অভিযোগগুলির মধ্যে কতটা সত্যতা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প কোন পথে এগোবে।
