রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর যেমন একের পর এক দুর্নীতি, অনিয়ম এবং প্রশাসনিক বিতর্ক নিয়ে নানা তথ্য প্রকাশ্যে আসছে, তেমনই বিনোদন জগতের অন্দরমহল নিয়েও নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। টলিউডের একাধিক অভিনেতা -অভিনেত্রী এখন প্রকাশ্যে দাবি করছেন, দীর্ঘদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রির ভিতরে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল যেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং প্রভাবশালী মহলের চাপ অনেক ক্ষেত্রেই শিল্পীদের পেশাগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করত। কেউ বলছেন ভয় পেয়ে চুপ থাকতে হয়েছিল, কেউ আবার অভিযোগ করছেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাজ থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। এই আবহেই অভিনেতা সুমন ব্যানার্জির সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তাঁর দাবি, দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শুধুমাত্র রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই তাঁকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে এবং সেই অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নয়, পুরো পরিবারকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে
টলিউডের পরিচিত মুখ সুমন ব্যানার্জি ২০১২ সালে বিজেপিতে যোগ দেন এবং তারপর থেকেই প্রকাশ্যে দলের সমর্থনে সরব ছিলেন। ২০১৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মালদহের ইংরেজবাজার কেন্দ্র থেকে বিজেপি প্রার্থী হিসেবেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। নির্বাচনে জয় না পেলেও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কখনও সরে আসেননি বলে দাবি অভিনেতার। বরং তাঁর কথায়, রাজনৈতিক সুবিধা বা ব্যক্তিগত লাভের আশায় দল করার মানসিকতা কখনও ছিল না। সেই কারণেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও অন্য কোনও রাজনৈতিক শিবিরে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। দীর্ঘদিন কাজের অভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক চাপ সত্ত্বেও নিজের মতাদর্শের সঙ্গে আপস না করার সিদ্ধান্তেই অনড় ছিলেন তিনি।
সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে সুমন ব্যানার্জি অকপটে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গত কয়েক বছর ধরে টলিউডে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি বড়সড় সমস্যার মুখে পড়েছিলেন। তাঁর দাবি, এর প্রভাব শুধু তাঁর পেশাগত জীবনে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সংসারের উপরও সরাসরি আঘাত হেনেছিল। কাজ কমে যাওয়ার ফলে আর্থিক চাপ বাড়তে থাকে, যা ধীরে ধীরে মানসিক অস্থিরতা ও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অভিনেতার কথায়, বহু রাত ঘুমহীন কেটেছে, হতাশা ও উদ্বেগে ভুগতে হয়েছে। তবে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল, এই সংগ্রাম তাঁকে একা করতে হয়নি তাঁর স্ত্রী ও সন্তানও একই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। সুমন বলেন, তিনি একা খিদে, হতাশা বা কান্না সহ্য করেননি, তাঁর পরিবারও সেই কষ্ট সমানভাবে বহন করেছে। সেই কঠিন সময়ের স্মৃতি এখনও তাঁকে নাড়া দেয় বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন অভিনেতা।
সুমন ব্যানার্জি আরও জানিয়েছেন, এতদিন তিনি প্রকাশ্যে নিজের দুর্দশার কথা বলতে চাননি। সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে কাজ না পাওয়ার অভিযোগ করা তাঁর স্বভাবের সঙ্গে যায় না বলেই তিনি নীরব ছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি মনে করছেন, সত্যিটা সামনে আনা প্রয়োজন। অভিনেতার দাবি, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে যদি কাজ হারাতেও হয়, তবুও তিনি নিজের অবস্থান বদলাতেন না। তাঁর বক্তব্য, মতাদর্শ কোনও সুবিধা পাওয়ার উপায় নয়, বরং ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধের অংশ। তাই ভয় বা চাপের কাছে মাথা নত করে কখনও নিজের ‘শিরদাঁড়া বিক্রি’ করেননি বলে মন্তব্য করেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে টলিউডে অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক পরিচয় দেখে কাজ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ইন্ডাস্ট্রির সামগ্রিক ক্ষতি হয়েছে এবং বহু প্রতিভাবান শিল্পী সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
আরও পড়ুনঃ “কষ্ট হচ্ছে কথা বলতে, কিন্তু অভিনয়ের খিদে ও দায়িত্ববোধটাই আসল!” প্রতিটি দৃশ্যে নিজের সেরাটাই দিয়েছে উজি! অসু’স্থতা উপেক্ষা করে আরাত্রিকা মাইতির অসাধারণ অভিনয়ে মুগ্ধ ‘জোয়ার ভাঁটা’র দর্শক, জানালেন কুর্নিশ! এখন কেমন আছেন অভিনেত্রী?
সাক্ষাৎকারে বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন সুমন ব্যানার্জি। তাঁর দাবি, অতীতের তুলনায় এখন রাজ্যের পরিবেশ অনেক বেশি শান্ত এবং মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপনের দিকে ফিরে যাচ্ছে। পাশাপাশি তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় পূর্ববর্তী সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কার্যকলাপ নিয়েও সমালোচনা করেন। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী। তাঁর বিশ্বাস, আগামী দিনে শিল্পীদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, যোগ্যতা এবং দক্ষতাই কাজ পাওয়ার প্রধান মাপকাঠি হবে। একইসঙ্গে তিনি মনে করেন, কোনও সরকারকেই চলচ্চিত্র শিল্পের সৃজনশীল পরিসরে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়, ইন্ডাস্ট্রির দায়িত্ব শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক এবং প্রযুক্তিবিদদের হাতেই থাকা প্রয়োজন। বাংলা সিনেমা ও সংস্কৃতি আবার নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়াক এই প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছেন অভিনেতা। তাঁর এই বিস্ফোরক বক্তব্য ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও বিনোদন মহলে জোর চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।
