বাংলা বাচিক শিল্পের অন্যতম পরিচিত মুখ ঊর্মিমালা বসু সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের ছোটবেলার পারিবারিক পরিবেশ এবং সেই সময়ের সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। তিনি জানান, একসময় পরিবারে ছোট ও বড়দের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন ছিল। বাড়িতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা বা পারিবারিক কোনও বিষয় নিয়ে কথা হলে ছোটদের সেই জায়গা থেকে সরে যেতে বলা হতো। ঊর্মিমালার কথায়, সবাই যে বিশাল প্রাসাদসম বাড়িতে থাকতেন এমন নয়, বরং একই বাড়িতে একসঙ্গেই বসবাস করতেন। কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে বড়দের প্রতি সম্মান এবং দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি তখন খুবই স্বাভাবিক ছিল। সেই পরিবেশেই বেড়ে ওঠায় শৃঙ্খলা ও সংযম জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল বলে তিনি মনে করেন।
সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, সেই সময় শুধু বড়দের সম্মান করাই নয়, কথাবার্তার ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা বজায় রাখা হতো। কোনও রকম খারাপ শব্দ মুখে আনা তো দূরের কথা, এমন শব্দ মনে এলেও অস্বস্তি কাজ করত। তবে সেই ভয় কারও বকুনি খাওয়ার জন্য ছিল না। তাঁর মতে, নিজের অবস্থান, শিক্ষা এবং ব্যক্তিত্ব যেন ছোট না হয়ে যায়, সেই ভাবনাই মানুষকে সংযত থাকতে শেখাত। তাই ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ ছিল, যা তখনকার প্রজন্মের মধ্যে খুব স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখা হতো। এই শিক্ষা পরিবার থেকেই পাওয়া যেত বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ঊর্মিমালা বসু জানান, এত বছর পরেও তিনি নিজের জীবনে সেই অভ্যাস বজায় রেখেছেন। আজও তিনি কোনও ধরনের অপশব্দ মুখে উচ্চারণ করেন না। তাঁর বিশ্বাস, ভাষা মানুষের ব্যক্তিত্বের অন্যতম পরিচয় বহন করে। তাই রাগ, অভিমান বা বিরক্তির মুহূর্তেও তিনি নিজের শব্দচয়নের প্রতি সচেতন থাকার চেষ্টা করেন। তাঁর মতে, মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক পরিবেশ ভাষার মধ্যেই সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়। সেই কারণেই তিনি এখনও সংযত ভাষা ব্যবহারের পক্ষেই থাকেন এবং এটিকে নিজের জীবনের অন্যতম মূল্যবোধ বলে মনে করেন।
অভিনয় জীবনের একটি অভিজ্ঞতার কথাও এই সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন ঊর্মিমালা বসু। তিনি বলেন, একসময় একটি ছবিতে চরিত্রের প্রয়োজনে তাঁকে মহানায়ক উত্তম কুমারকে গালাগালি দিতে হয়েছিল। যদিও সেটি ছিল সম্পূর্ণ অভিনয়ের অংশ এবং চিত্রনাট্যের প্রয়োজনেই সেই সংলাপ বলতে হয়েছিল। বাস্তব জীবনে তিনি কখনও এমন ভাষা ব্যবহার করেননি বলেই স্পষ্ট জানান ঊর্মিমালা। তাঁর মতে, একজন শিল্পী হিসেবে চরিত্রের প্রয়োজনে অনেক কিছুই করতে হয়, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের মূল্যবোধ এবং বাস্তব আচরণ সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
আরও পড়ুনঃ “যেমন দেবা, তেমনই দেবী…এভাবেই কেঁদে কেঁদে দুজনে সংসার করছে!” ‘স্ত্রীকে মা’নসিক যন্ত্র’ণা দিয়ে আবার নিজের কান্নায় গলিয়ে দেয় সম্রাট, ঝিনুকের স্বামীর চোখের জল দেখেই ভেঙে পড়ে! কী প্রেম ভাই!’ ‘কমলা নিবাস’-এর সাম্প্রতিক পর্বে বিষা’ক্ত সম্পর্কের প্রবল প্রেম দেখে হাসাহাসি দর্শকদের!
বর্তমান সময়ের ভাষা ব্যবহারের প্রসঙ্গেও নিজের মতামত জানিয়েছেন ঊর্মিমালা বসু। তাঁর কথায়, আজকের প্রজন্মের অনেকের কাছেই অপশব্দ ব্যবহার যেন একটি নতুন প্রবণতা বা “নিউ থিং” হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও তিনি কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেননি, তবুও তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে ভাষার সৌন্দর্য এবং সংযম বজায় রাখার গুরুত্ব আজও তিনি সমানভাবে বিশ্বাস করেন। অতীতের শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ভদ্র ভাষা ব্যবহারের অভ্যাস মানুষকে আলাদা পরিচয় দেয় বলেই তাঁর মত। সেই কারণেই তিনি এখনও নিজের জীবনে সেই মূল্যবোধ অটুট রেখেছেন।
