বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের দুই কিংবদন্তি উত্তম কুমার এবং ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বয়সে উত্তম কুমার ছোট হলেও ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি ‘ভানুদা’ বলেই ডাকতেন এবং তাঁর পরামর্শকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। ভানু-কন্যা বাসবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে উত্তম কুমার ছিলেন শুধুই মহানায়ক নন, ছিলেন পরিবারের অত্যন্ত কাছের ‘উত্তম কাকু’। তবে এই গভীর বন্ধুত্বের মধ্যেও একসময় অভিমান এবং দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। এমনকি কিছুদিন দু’জনের কথাবার্তাও বন্ধ ছিল। পরে উত্তম কুমার যখন ভানুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কেমন আছিস?’, তখন অভিমানী ভানু তাঁকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। উত্তমও অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘তুই আমাকে আপনি বলছিস কেন?’
বাসবীর কথায়, উত্তম কুমারকে তিনি কখনও রাগী মানুষ হিসেবে দেখেননি, বরং তাঁর মধ্যে অভিমানটাই বেশি ছিল। তবে তাঁর বাবা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ও নিজের মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে কখনও পিছিয়ে থাকতেন না। উত্তম কুমার যখন ভবানীপুরের বাড়ি ছেড়ে ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে থাকতে শুরু করেন, সেই সিদ্ধান্ত ভানুর একেবারেই ভালো লাগেনি। বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও মহানায়কের এই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর মনে যথেষ্ট কষ্ট ছিল। বাসবীর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, উত্তম কুমারের এই নতুন সংসারকে তাঁর বাবা সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। তবে তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে সেই মতবিরোধ থাকলেও উত্তম কুমারের প্রতি ভানুর স্নেহ এবং পুরনো বন্ধুত্ব পুরোপুরি মুছে যায়নি।
এই বিষয়টিরই একটি মজার অথচ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা উঠে এসেছে বাসবীর স্মৃতিতে। তাঁর বিয়ের সময় নিমন্ত্রণ করতে গিয়ে উত্তম কুমার এবং সুপ্রিয়া দেবীর জন্য দুটি আলাদা নিমন্ত্রণপত্র নিয়ে গিয়েছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে গিয়ে সেই কার্ড দেওয়ার পর সুপ্রিয়া দেবী নাকি বলেছিলেন, তাঁদের দু’জনের জন্য আলাদা কার্ড দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না, একটি কার্ড দিলেই হয়ে যেত। কিন্তু নিজের স্বভাবসিদ্ধ স্পষ্ট কথায় ভানু তখন যে উত্তর দিয়েছিলেন, সেটিই আজও বাসবীর মনে রয়েছে। সুপ্রিয়া দেবীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন, “না রে, তোরে আমি মিসেস চ্যাটার্জি বলে মানতে পারুম না, তাই গৌরীরে আগে গিয়া কার্ড দিয়ে আইসি।” তাঁর এই কথার মধ্যেই একদিকে যেমন রসিকতা ছিল, তেমনই ছিল সেই সময়ের তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থানের স্পষ্ট প্রকাশ।
অন্যদিকে, উত্তম কুমারের সঙ্গে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক যে কতটা আপন ছিল, বাসবীর আরও কিছু স্মৃতিতেও তার পরিচয় মেলে। ছোটবেলা থেকেই উত্তম কুমারের তাঁদের বাড়িতে আসা-যাওয়া ছিল। ‘চৌরঙ্গী’ ছবির শুটিংয়ের সময় গ্র্যান্ড হোটেলের একটি ঘরে উত্তম কুমারের রিহার্সাল দেখেছিলেন বাসবী। কোনও দৃশ্যে খুব মন দিয়ে অভিনয় করার সময় মহানায়কের চোখের বিশেষ ভঙ্গিকে ভানু মজা করে ‘লক্ষ্মী ট্যারা’ বলতেন। রিহার্সাল শেষে উত্তম কুমার বাসবীকে বলেছিলেন, অনেকক্ষণ হয়ে গিয়েছে, এবার চল, ‘বেনু’ অর্থাৎ সুপ্রিয়া দেবী খাবার পাঠিয়েছেন। এই ছোট ছোট স্মৃতিই তাঁদের সম্পর্কের গভীরতা বুঝিয়ে দেয়। তাই মতের অমিল বা অভিমান থাকলেও ভানুর কাছে উত্তম ছিলেন পরিবারের একজন অত্যন্ত আপন মানুষ।
আরও পড়ুনঃ “সম্রাটকে ছেড়ে কী করে বাপের বাড়ি যাবে?” “বাপের বাড়িতেও কি শান্তি আছে?” “এই দুই দাদার কাছে ফিরবে ঝিনুক?” বোকামি নয়, অসহায়তা! ঝিনুক কেন সম্রাটকে ছেড়ে যেতে পারে না, বুঝিয়ে দিলেন দর্শকরা!
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তম কুমারের মৃত্যুর খবর ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারেও গভীর শোক নিয়ে এসেছিল। বাসবীর কথায়, তাঁদের মনে হয়েছিল নিজেদের একজন মানুষ, নিজের কাকার মতো কাছের কেউ চলে গেলেন। উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর তাঁর বাবা তাঁকে ভীষণভাবে মিস করতেন বলেও জানান বাসবী। বন্ধুত্বের মাঝে অভিমান, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধ কিংবা কিছুদিনের নীরবতা, কোনও কিছুই সেই দীর্ঘদিনের সম্পর্কের গুরুত্বকে মুছে দিতে পারেনি। তাই ভানু-কন্যার স্মৃতিতে উত্তম কুমার আজও শুধুই বাংলা সিনেমার মহানায়ক নন, তিনি তাঁদের পরিবারের ‘উত্তম কাকু’। আর মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র নিয়ে ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে গিয়ে ভানুর সেই স্পষ্ট মন্তব্য আজও দুই কিংবদন্তির সম্পর্কের এক অজানা অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
