বাংলা বিনোদন জগতের ঝলমলে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকে শিল্পীদের দীর্ঘ সংগ্রাম, কঠোর পরিশ্রম এবং অসংখ্য ত্যাগের গল্প। দর্শকরা সাধারণত একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে সফলতার শিখরে দেখতে পান, কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনে কত রাতের ঘুমহীন অপেক্ষা, কত অনিশ্চয়তা আর কত প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়, তা খুব কম মানুষই জানেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা শিল্পীদের ক্ষেত্রে এই লড়াই আরও কঠিন হয়ে ওঠে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের সেই অজানা অধ্যায় এবং পরিবারের অবদানের কথা খোলাখুলি তুলে ধরলেন অভিনেত্রী অনুষ্কা চক্রবর্তী (Anushka Chakraborty)।
বর্তমানে টেলিভিশন মাধ্যমে পরিচিত মুখ অনুষ্কা চক্রবর্তী। আগরপাড়ার সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা অনুষ্কার অভিনয় জগতে প্রবেশের গল্পও বেশ ব্যতিক্রমী। ছোটবেলা থেকেই থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। পড়াশোনাতেও ছিলেন মেধাবী। তবে অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রথম থেকেই পরিকল্পিত ছিল না। কলেজে পড়ার সময় টিউশন পড়িয়ে নিজের খরচ চালাতেন। পরে একটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, অভিনয়ই হতে পারে তাঁর ভবিষ্যতের পথ। সেই শুরু, তারপর ধীরে ধীরে মডেলিং, ভয়েস ওভার এবং অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন তিনি।

সাক্ষাৎকারে অনুষ্কা জানান, জীবনের এক সময় তাঁর পরিবারকে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এতটাই কঠিন হয়ে উঠেছিল যে আত্মীয়-স্বজন এবং পরিচিতরা চাইতেন তিনি দ্রুত পড়াশোনা শেষ করে একটি স্থায়ী চাকরিতে যোগ দিন। কিন্তু সেই সময়েও তাঁর বাবা-মা কখনও নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেননি। বরং মেয়ের স্বপ্নের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনুষ্কার কথায়, এমনও সময় এসেছে যখন শুধুমাত্র অর্থের জন্য এমন কিছু কাজ করতে রাজি হয়েছিলেন, যা করতে তাঁর একেবারেই ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু সেই মুহূর্তে তাঁর বাবা এসে বলেছিলেন, “যেতে হবে না, ছেড়ে দে, দেখা যাবে কী হয়।” সেই বিশ্বাস এবং মানসিক সমর্থনই তাঁকে বারবার নতুন করে লড়াই করার শক্তি দিয়েছে। করোনাকালের ধাক্কায় পরিবারের ব্যবসাও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছিল বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা। সেই ঋণ শোধ করতেও পরিবারকে দীর্ঘ সময় সংগ্রাম করতে হয়েছে।
তবে শুধু সংগ্রামের সময় নয়, সাফল্যের প্রতিটি মুহূর্তেও মেয়ের পাশে থেকেছেন অনুষ্কার বাবা-মা। থিয়েটারের দিনগুলোতে গভীর রাত পর্যন্ত মেয়ের ফেরার অপেক্ষায় থাকতেন তাঁর বাবা। কখনও বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে খেতে অপেক্ষা করেছেন, কখন মেয়ে ফিরবে। অন্যদিকে অনুষ্কার মা ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় সমালোচক এবং সমর্থক। প্রতিটি নাটক, প্রতিটি শো তিনি দর্শকদের মধ্যে বসে দেখতেন এবং বাড়ি ফিরে কোথায় ভালো হয়েছে, কোথায় ভুল হয়েছে, তা বিস্তারিত আলোচনা করতেন। অনুষ্কার কথায়, তাঁর মা-ই ছিলেন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সমালোচক।
আরও পড়ুনঃ স্বামীকে বিয়ে করতে মরিয়া অন্য নারী, দিলেন প্রাণনা’শের হু’মকিও! ক্ষেপে আগুন বাঙালি টেলি নায়িকা স্ত্রী! সংসার বাঁচাতে কী করলেন তিনি? জানলে চমকাবেন
সাক্ষাৎকারের এক আবেগঘন মুহূর্তে উঠে আসে মেয়ের বিয়ের প্রসঙ্গও। অনুষ্কার বাবাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি স্বীকার করেন, মেয়ের বিয়ের কথা ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যায়। হাসতে হাসতেই তিনি বলেন, “লিজা তো আমাদের ছেলে ছিল। মেয়ের বিয়ের কথা শুনলে একটু মন খারাপ হয়ই।” কথার মাঝেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে একজন বাবার আবেগ। মেয়ের নতুন জীবনের জন্য আনন্দ থাকলেও, তাকে ছেড়ে দেওয়ার কষ্ট যে সহজ নয়, সেটাও অকপটে স্বীকার করেন তিনি। দীর্ঘ সংগ্রাম, অটুট পারিবারিক বন্ধন এবং বাবা-মায়ের নিঃস্বার্থ সমর্থনের এই গল্প যেন আরও একবার প্রমাণ করে, একজন শিল্পীর সাফল্যের পেছনে তাঁর পরিবারের অবদান কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
